Tue. Jul 7th, 2026

ভিসা কার্ড ও মাস্টার কার্ডের পার্থক্য কি? বাংলাদেশের কোন কোন ব্যাংক এই দুটি কার্ড দেয়?

ভিসা কার্ড ও মাস্টার কার্ডের পার্থক্য.png

সর্বশেষ তথ্য হালনাগাদ: জুলাই ২০২৬ | এই নিবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য, আন্তর্জাতিক কার্ড নেটওয়ার্কের সাধারণ কার্যপদ্ধতি এবং প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে নগদ অর্থ বহনের পরিবর্তে ব্যাংক কার্ড ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনলাইন কেনাকাটা, বিদেশে ভ্রমণ, আন্তর্জাতিক সেবা গ্রহণ কিংবা দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মূল্য পরিশোধ সব ক্ষেত্রেই ডেবিট, ক্রেডিট এবং প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। এই কার্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত দুটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক হলো ভিসা এবং মাস্টারকার্ড। কিন্তু অনেকেই মনে করেন এগুলো আলাদা ধরনের ব্যাংক। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ভিসা এবং মাস্টারকার্ড আসলে কোনো ব্যাংক নয়। এগুলো আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ নেটওয়ার্ক, যাদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিরাপদে অর্থ লেনদেন সম্পন্ন করে। অর্থাৎ আপনার কার্ডটি ইস্যু করে একটি ব্যাংক, কিন্তু সেই কার্ড কোন নেটওয়ার্কে পরিচালিত হবে সেটি নির্ধারণ করে ভিসা অথবা মাস্টারকার্ড।

বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, আন্তর্জাতিক শিক্ষা, সফটওয়্যার সেবা, বিদেশ ভ্রমণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার মূল্য পরিশোধে আন্তর্জাতিক ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন ব্যবহারকারীদের অনেকেই জানতে চান ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য কী এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কোনটি নির্বাচন করা বেশি যুক্তিযুক্ত।

এই নিবন্ধে আমরা জানব ভিসা ও মাস্টারকার্ডের প্রকৃত পার্থক্য, কোন পরিস্থিতিতে কোনটি বেশি সুবিধাজনক, নিরাপত্তার দিক থেকে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের কোন কোন ব্যাংক বর্তমানে এই দুটি আন্তর্জাতিক কার্ড প্রদান করছে।

ভিসা ও মাস্টারকার্ড আসলে কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ভিসা এবং মাস্টারকার্ড হলো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক। যখন আপনি কোনো দোকানে কার্ড ব্যবহার করেন অথবা অনলাইনে মূল্য পরিশোধ করেন, তখন আপনার ব্যাংক থেকে বিক্রেতার ব্যাংকে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ফলে লেনদেন দ্রুত, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। বিভিন্ন ব্যাংক একই ধরনের ডেবিট, ক্রেডিট অথবা প্রিপেইড কার্ড ভিসা কিংবা মাস্টারকার্ড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রদান করে।

ভিসা কার্ড ও মাস্টারকার্ডের মূল পার্থক্য

আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মূল কাজ প্রায় একই। উভয় নেটওয়ার্কই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিরাপদ লেনদেন সম্পন্ন করে। তবে অংশীদার প্রতিষ্ঠান, বিশেষ সুবিধা, নির্দিষ্ট অফার, কিছু প্রযুক্তিগত সেবা এবং ব্যাংকভেদে প্রদত্ত সুবিধার ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।

সংক্ষেপে ভিসা ও মাস্টারকার্ডের পার্থক্য

বিষয় ভিসা মাস্টারকার্ড
বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা খুব বেশি খুব বেশি
নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত উন্নত
ডেবিট কার্ড পাওয়া যায় পাওয়া যায়
ক্রেডিট কার্ড পাওয়া যায় পাওয়া যায়
অনলাইন লেনদেন সমর্থিত সমর্থিত
ব্যাংকভেদে সুবিধা ভিন্ন হতে পারে ভিন্ন হতে পারে

১. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা

ভিসা এবং মাস্টারকার্ড উভয়ই বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গ্রহণযোগ্য। ভিসা প্রায় দুই শতাধিক দেশে ব্যবহৃত হয় এবং মাস্টারকার্ডও প্রায় একই পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা বিদেশি সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি কার্ডই সমানভাবে কার্যকর। তাই শুধুমাত্র গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে একটি অন্যটির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে আছে এমন বলা যায় না।

২. নিরাপত্তা ব্যবস্থা

উভয় নেটওয়ার্কই আধুনিক ইএমভি চিপ প্রযুক্তি, একবার ব্যবহারযোগ্য যাচাইকরণ কোড, দ্বি-ধাপ যাচাইকরণ এবং উন্নত প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব নতুন কার্ডেই চিপ প্রযুক্তি এবং নিরাপদ অনলাইন যাচাইকরণ ব্যবস্থা যুক্ত থাকে। ফলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দুটি নেটওয়ার্কই উচ্চমান বজায় রাখে।

৩. বিশেষ সুবিধা ও অফার

ভিসা এবং মাস্টারকার্ড উভয় নেটওয়ার্কই বিভিন্ন সময়ে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল্যছাড়, ভ্রমণ-সংক্রান্ত সুবিধা, বিমানবন্দর লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ এবং অন্যান্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। তবে এসব সুবিধা সব কার্ডের ক্ষেত্রে এক নয়। একই নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কার্ডেও সুবিধা ভিন্ন হতে পারে। তাই কার্ড নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বর্তমান সুবিধার তালিকা যাচাই করা উচিত।

৪. ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

অনেকেই মনে করেন ভিসা বা মাস্টারকার্ড নির্বাচন করলেই সব সুবিধা পাওয়া যাবে। বাস্তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্ডটি কোন ব্যাংক ইস্যু করছে। একই ধরনের ভিসা কার্ড দুটি ভিন্ন ব্যাংকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুবিধা, ফি, বাৎসরিক চার্জ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবহারের নীতিমালা নিয়ে আসতে পারে। তাই কার্ড নির্বাচন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুবিধা ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের কোন কোন ব্যাংক ভিসা ও মাস্টারকার্ড প্রদান করে?

বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি এবং কয়েকটি সরকারি ব্যাংক আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ভিসা অথবা মাস্টারকার্ডভিত্তিক ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড প্রদান করে। কিছু ব্যাংক দুটি নেটওয়ার্কই সরবরাহ করে, আবার কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট ধরনের কার্ডে একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক আন্তর্জাতিক ডেবিট, ক্রেডিট অথবা প্রিপেইড কার্ড ইস্যু করে থাকে। তবে সব ব্যাংক একই ধরনের কার্ড প্রদান করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলো নতুন কার্ড চালু করা, পুরোনো কার্ড পরিবর্তন করা অথবা আন্তর্জাতিক সুবিধা হালনাগাদ করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কার্ডের সর্বশেষ তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সরকারি ওয়েবসাইট বা গ্রাহকসেবা থেকে তথ্য নিশ্চিত করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

ভিসা ও মাস্টারকার্ড সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

ভিসা এবং মাস্টারকার্ড সম্পর্কে অনেকের মধ্যেই কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এগুলো আলাদা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বাস্তবে ভিসা ও মাস্টারকার্ড কোনো ব্যাংক নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ নেটওয়ার্ক, যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের কার্ড পরিচালনা করে। আবার অনেকের ধারণা ভিসা সব সময় মাস্টারকার্ডের চেয়ে ভালো, অথবা মাস্টারকার্ড সব জায়গায় বেশি গ্রহণযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে দুটি নেটওয়ার্কই বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং কোনটি আপনার জন্য উপযোগী হবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সেবা, কার্ডের ধরন, ফি এবং আপনার ব্যবহারের প্রয়োজনের ওপর।

কার্ড নির্বাচন করার আগে নিজের প্রয়োজন মূল্যায়ন করুন

কার্ড নির্বাচন করার আগে প্রথমে নির্ধারণ করুন আপনি কী ধরনের লেনদেন বেশি করবেন। যদি আপনার ব্যবহার শুধুমাত্র দেশে এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলন, দোকানে মূল্য পরিশোধ এবং অনলাইন কেনাকাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সাধারণ আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ডই যথেষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে বিদেশে পড়াশোনা, আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার সেবা ব্যবহার, বিদেশ ভ্রমণ অথবা বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজন থাকলে ব্যাংকের আন্তর্জাতিক সুবিধাসম্পন্ন কার্ড নির্বাচন করা অধিক কার্যকর হতে পারে। তাই শুধুমাত্র কার্ডের নাম দেখে নয়, নিজের প্রয়োজন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

কোন ধরনের কার্ড নির্বাচন করা উচিত?

যদি আপনার প্রধান প্রয়োজন হয় দেশে দৈনন্দিন লেনদেন, এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলন এবং অনলাইন কেনাকাটা, তাহলে সাধারণ ডেবিট কার্ডই যথেষ্ট হতে পারে। নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ, আন্তর্জাতিক সেবা গ্রহণ কিংবা উচ্চমূল্যের লেনদেনের প্রয়োজন হলে প্রিমিয়াম ক্রেডিট কার্ড অধিক উপযোগী হতে পারে। আবার যারা নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে চান, তাদের জন্য প্রিপেইড কার্ড একটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।

কার্ড ব্যবহারের সময় গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কখনোই কার্ডের নম্বর, গোপন নম্বর অথবা যাচাইকরণ কোড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। অপরিচিত ওয়েবসাইটে কার্ড ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং নিয়মিত ব্যাংকের লেনদেন বিবরণী পরীক্ষা করা উচিত। মোবাইলে লেনদেন সংক্রান্ত বার্তা চালু রাখলে সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

ভিসা নাকি মাস্টারকার্ড কোনটি আপনার জন্য বেশি উপযোগী?

বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, ভিসা কিংবা মাস্টারকার্ডের মধ্যে একটি নির্দিষ্টভাবে সবার জন্য সেরা এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কারণ দুটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কই উন্নত প্রযুক্তি, উচ্চ নিরাপত্তা এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে। আপনার জন্য কোন কার্ডটি বেশি উপযোগী হবে, সেটি নির্ভর করবে আপনি কী উদ্দেশ্যে কার্ড ব্যবহার করবেন এবং কোন ব্যাংকের গ্রাহক।

যদি আপনি মূলত দেশের ভেতরে এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলন, দোকানে মূল্য পরিশোধ এবং অনলাইন কেনাকাটার জন্য কার্ড ব্যবহার করেন, তাহলে ভিসা ও মাস্টারকার্ড উভয়ই সমানভাবে কার্যকর। অন্যদিকে নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার খরচ, বিদেশি সফটওয়্যার বা ডিজিটাল সেবা কেনা কিংবা আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়োজন হলে, আপনার ব্যাংক যে কার্ডে ভালো বৈদেশিক সুবিধা, কম ফি এবং উন্নত গ্রাহকসেবা দিচ্ছে সেটি বেছে নেওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত।

কার্ড নেওয়ার আগে যেসব বিষয় যাচাই করা উচিত

শুধু কার্ডের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একটি কার্ড গ্রহণের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভালোভাবে যাচাই করলে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঝামেলা এড়ানো যায়।

  • বার্ষিক ফি কত।
  • আন্তর্জাতিক লেনদেনের অতিরিক্ত চার্জ রয়েছে কি না।
  • এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলনের ফি কত।
  • অনলাইন লেনদেন চালু বা বন্ধ করার সুবিধা আছে কি না।
  • মোবাইল অ্যাপ থেকে কার্ড নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না।
  • চব্বিশ ঘণ্টার গ্রাহকসেবা পাওয়া যায় কি না।
  • বিদেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সুবিধা রয়েছে কি না।
  • কোন ধরনের মূল্যছাড়, পুরস্কার বা বিশেষ অফার দেওয়া হয়।

এসব বিষয় যাচাই করে কার্ড নির্বাচন করলে একই নেটওয়ার্কের মধ্যেও আপনার জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিকল্পটি বেছে নেওয়া সহজ হবে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের বর্তমান প্রবণতা

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, সফটওয়্যার সেবা, বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক কার্ডের চাহিদাও বেড়েছে। পাশাপাশি অধিকাংশ ব্যাংক এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কার্ড চালু বা বন্ধ করা, লেনদেনের সীমা নির্ধারণ এবং তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাওয়ার মতো আধুনিক সুবিধা প্রদান করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তাই বিদেশে ব্যবহারের আগে বা আন্তর্জাতিক অনলাইন লেনদেনের পূর্বে নিজের ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর

১. ভিসা এবং মাস্টারকার্ড কি আলাদা ব্যাংক?

না। ভিসা এবং মাস্টারকার্ড কোনো ব্যাংক নয়। এগুলো আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ নেটওয়ার্ক, যেগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক নিরাপদে কার্ডভিত্তিক লেনদেন সম্পন্ন করে। অর্থাৎ আপনি যে ব্যাংক থেকে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড সংগ্রহ করেন, সেই ব্যাংকই কার্ডটি ইস্যু করে। ভিসা বা মাস্টারকার্ড কেবল সেই কার্ডের আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রদান করে। তাই এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যাংকের বিকল্প হওয়া নয়, বরং ব্যাংকগুলোর লেনদেনকে বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত করা।

২. নিরাপত্তার দিক থেকে কোনটি ভালো?

দুটি নেটওয়ার্কই অত্যাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে। চিপ প্রযুক্তি, একবার ব্যবহারযোগ্য যাচাইকরণ কোড, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ অনলাইন যাচাইকরণ সবই উভয় নেটওয়ার্কে বিদ্যমান। তাই নিরাপত্তার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। নিরাপদ ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৩. অনলাইন কেনাকাটার জন্য কোন কার্ড ভালো?

অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে ভিসা এবং মাস্টারকার্ড উভয়ই নির্ভরযোগ্য। কোনটি আপনার জন্য ভালো হবে, তা নির্ভর করে আপনার ব্যাংকের আন্তর্জাতিক লেনদেন সুবিধা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিরিক্ত চার্জ এবং গ্রাহকসেবার ওপর। অনেক ব্যাংক অনলাইন লেনদেন চালু বা বন্ধ করার সুবিধা, তাৎক্ষণিক লেনদেন বার্তা এবং নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের সুযোগ দিয়ে থাকে। এসব সুবিধা বিবেচনা করলে নিরাপদ এবং সুবিধাজনকভাবে অনলাইন লেনদেন করা সম্ভব হয়।

৪. বিদেশে গেলে কোন কার্ড ব্যবহার করা উচিত?

বিদেশ ভ্রমণের সময় ভিসা এবং মাস্টারকার্ড উভয়ই ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। তবে ভ্রমণের আগে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্তর্জাতিক লেনদেন সক্রিয় আছে কি না এবং প্রযোজ্য চার্জ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

৫. বাংলাদেশের সব ব্যাংক কি ভিসা ও মাস্টারকার্ড দেয়?

সব ব্যাংক নয়। তবে অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক অন্তত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের কার্ড প্রদান করে। অনেক ব্যাংক আবার একই সঙ্গে ভিসা এবং মাস্টারকার্ড উভয় ধরনের কার্ডও ইস্যু করে।

৬. ডেবিট কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ডের মধ্যে পার্থক্য কী?

ডেবিট কার্ডে আপনার ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ থেকেই লেনদেন হয়। অন্যদিকে ক্রেডিট কার্ডে ব্যাংক নির্ধারিত একটি ঋণসীমা প্রদান করে, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। দুটি কার্ডই ভিসা অথবা মাস্টারকার্ড নেটওয়ার্কে পরিচালিত হতে পারে।

৭. আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য আলাদা অনুমতি লাগে কি?

অনেক ব্যাংকে নিরাপত্তার কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেন আলাদাভাবে সক্রিয় করতে হয়। কিছু ব্যাংকে মোবাইল অ্যাপ থেকেই এটি চালু করা যায়, আবার কোথাও গ্রাহকসেবার মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।

৮. কার্ড হারিয়ে গেলে কী করা উচিত?

কার্ড হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে কার্ডটি সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে অননুমোদিত লেনদেনের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

৯. একই ব্যক্তি কি ভিসা এবং মাস্টারকার্ড দুটিই ব্যবহার করতে পারেন?

অবশ্যই পারেন। অনেক গ্রাহক ভিন্ন ব্যাংকের একাধিক কার্ড ব্যবহার করেন। এতে বিভিন্ন অফার, আন্তর্জাতিক সুবিধা এবং লেনদেনের বিকল্প বাড়ে। তবে প্রতিটি কার্ডের বার্ষিক ফি ও অন্যান্য চার্জ বিবেচনা করা উচিত।

১০. নতুন ব্যবহারকারীর জন্য কোন কার্ডটি বেশি উপযোগী?

নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য প্রথমে নিজের ব্যাংকের সাধারণ আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ড দিয়ে শুরু করা অনেক সময় সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চ সুবিধাসম্পন্ন কার্ড নির্বাচন করা যেতে পারে। ভিসা বা মাস্টারকার্ড দুটির যেকোনো একটি হতে পারে, যদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সেবা আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সম্পাদকীয় মন্তব্য

এই নিবন্ধটি প্রস্তুত করার সময় বাংলাদেশে পরিচালিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত কার্ড-সংক্রান্ত তথ্য, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ কার্যপদ্ধতি এবং প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালা পর্যালোচনা করা হয়েছে। যেহেতু ব্যাংকের কার্ড, ফি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবহারের নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা উচিত।

উপসংহার

ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। বাস্তবে দুটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কই বিশ্বজুড়ে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ এবং ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। তাই কার্ড নির্বাচন করার সময় শুধুমাত্র ভিসা বা মাস্টারকার্ড নামের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ফি, গ্রাহকসেবা, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সুবিধা এবং অতিরিক্ত অফার বিবেচনা করা উচিত। সঠিক তথ্য জেনে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত কার্ড নির্বাচন করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।

By Admin

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *