একসময় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে ফরম পূরণ, ছবি জমা, পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং শাখায় উপস্থিত হওয়া প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। এখন বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক ডিজিটাল পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দিচ্ছে। একটি স্মার্টফোন বা কম্পিউটার, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নিজের পরিচয় যাচাই করার জন্য লাইভ ছবি থাকলেই অনেক ক্ষেত্রে আবেদন শুরু করা যায়।
এই প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হলো ই-কেওয়াইসি, অর্থাৎ ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই। বাংলাদেশ ব্যাংক ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে হালনাগাদ ই-কেওয়াইসি নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যা ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে বৈধ এনআইডিধারী ব্যক্তির ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, মুখমণ্ডল মিলিয়ে দেখা, গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরিচয় যাচাইয়ের নিয়ম আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ হলেও সব ব্যাংকের নিয়ম এক নয়। কোনো ব্যাংকে শুধু এনআইডি ও লাইভ সেলফি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধরনের হিসাব খোলা যায়, আবার নিয়মিত বা বেশি লেনদেনের হিসাবের জন্য ঠিকানার প্রমাণ, আয়ের উৎস বা অন্য কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক হিসাব নির্বাচন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- তথ্য হালনাগাদ: এই লেখাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ ই-কেওয়াইসি নির্দেশিকা ও সাধারণ ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যাংকের হিসাবের শর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, চার্জ ও লেনদেনসীমা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা গ্রাহকসেবা থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করুন।
অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা কীভাবে কাজ করে?
অনলাইন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যাংক প্রথমে আবেদনকারীর পরিচয় ডিজিটালভাবে যাচাই করে। সাধারণত এনআইডির সামনের ও পেছনের অংশের ছবি নেওয়া হয় এবং সেখানকার তথ্য জাতীয় পরিচয় তথ্যভান্ডারের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। নিজে অনলাইনে আবেদন করার ক্ষেত্রে লাইভ ছবি বা সেলফি নিয়ে এনআইডিতে সংরক্ষিত ছবির সঙ্গে মুখ মিলিয়ে দেখা হতে পারে। পরিচয় যাচাই সফল হলে ব্যক্তিগত তথ্য, নমিনি এবং হিসাবসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হয়।
অ্যাকাউন্ট খোলার আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
মাত্র এনআইডি হাতে নিয়ে আবেদন শুরু করার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকে প্রস্তুত রাখলে মাঝপথে আবেদন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। ব্যাংক ও হিসাবের ধরন অনুযায়ী কাগজপত্রের তালিকায় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণভাবে নিচের বিষয়গুলো প্রস্তুত রাখা ভালো।
- নিজের বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি
- সক্রিয় মোবাইল নম্বর
- ব্যবহারযোগ্য ই-মেইল ঠিকানা থাকলে সেটি
- পরিষ্কার লাইভ সেলফি তোলার উপযোগী ক্যামেরাযুক্ত ফোন
- নমিনির নাম, জন্মতারিখ, ছবি এবং প্রযোজ্য পরিচয়পত্র
- স্বাক্ষরের পরিষ্কার ছবি, যদি ব্যাংক চায়
- ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বা অন্য গ্রহণযোগ্য বিল, যদি প্রয়োজন হয়
- আয়ের উৎস বা পেশার প্রমাণ, নিয়মিত হিসাবের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে
- ই-টিআইএন, যদি নির্দিষ্ট হিসাব বা ব্যাংকের নিয়মে প্রয়োজন হয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের ই-কেওয়াইসি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নমিনির ক্ষেত্রে এনআইডি প্রয়োজন। নমিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা যায়।
ঘরে বসে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ধাপ
ব্যাংকভেদে পর্দার নকশা ও অপশনের নাম আলাদা হলেও মূল প্রক্রিয়াটি প্রায় একই। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে পুরো বিষয়টি সহজে বোঝা যায়।
- ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করুন: প্রথমে নিশ্চিত করুন আপনি ব্যাংকের আসল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া অজানা লিংকের মাধ্যমে এনআইডি জমা দেওয়া উচিত নয়।
- হিসাবের ধরন নির্বাচন করুন: সঞ্চয়ী, চলতি অথবা ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল হিসাবের মধ্য থেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচন করুন। নিয়মিত বা তুলনামূলক বেশি লেনদেনের প্রয়োজন থাকলে হিসাবটির দৈনিক ও মাসিক লেনদেনসীমা আগে যাচাই করুন।
- মোবাইল নম্বর যাচাই করুন: সাধারণত একটি ওটিপি পাঠিয়ে মোবাইল নম্বর নিশ্চিত করা হয়। এই কোড অন্য কাউকে জানানো উচিত নয়।
- এনআইডির ছবি তুলুন: এনআইডির সামনের ও পেছনের অংশ সম্পূর্ণ ফ্রেমের মধ্যে রাখুন। আলো প্রতিফলিত হলে তথ্য পড়তে সমস্যা হতে পারে।
- লাইভ সেলফি দিন: ভালো আলোতে ক্যামেরার দিকে সোজা তাকান। চশমা, অতিরিক্ত ছায়া বা অস্পষ্ট ক্যামেরা মুখমণ্ডল যাচাই ব্যর্থ করার কারণ হতে পারে।
- ব্যক্তিগত তথ্য পরীক্ষা করুন: এনআইডি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য সঠিক আছে কি না দেখুন। নিজের ইচ্ছায় তথ্য পরিবর্তন করে এনআইডির সঙ্গে অমিল তৈরি করবেন না।
- নমিনির তথ্য দিন: নমিনির নাম, সম্পর্ক, পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনীয় ছবি সঠিকভাবে যোগ করুন।
- পেশা ও অর্থের উৎস জানান: নিয়মিত হিসাবের ক্ষেত্রে ব্যাংক চাকরি, ব্যবসা বা অন্যান্য বৈধ আয়ের উৎস সম্পর্কে তথ্য চাইতে পারে।
- স্বাক্ষর ও শর্ত যাচাই করুন: ব্যাংক চাইলে স্বাক্ষরের ছবি দিতে হতে পারে। আবেদন জমা দেওয়ার আগে হিসাব পরিচালনার নিয়ম ও চার্জ পড়ে নিন।
- নিশ্চিতকরণ বার্তার অপেক্ষা করুন: যাচাই শেষ হলে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ই-মেইলে অ্যাকাউন্ট খোলার নিশ্চিতকরণ আসবে।
লাইভ সেলফি দেওয়ার সময় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ডিজিটাল আবেদন সম্পন্ন করতে মুখমণ্ডল যাচাই সফল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিজে অনলাইনে আবেদন করার ক্ষেত্রে লাইভ সেলফি নিতে হয় এবং সেই ছবি জাতীয় পরিচয় তথ্যভান্ডারে থাকা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। একটি সেশনে সর্বোচ্চ ১০ বার চেষ্টা, ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ দুটি সেশন এবং একজন গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ তিনটি সেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে। মুখ যাচাই ব্যর্থ হলে আঙুলের ছাপ যাচাই বা কাগজভিত্তিক কেওয়াইসি পদ্ধতির বিকল্প দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
ব্যবহারিকভাবে সাদা বা সাধারণ পটভূমি, সামনের দিক থেকে পর্যাপ্ত আলো এবং চোখের সমান উচ্চতায় ক্যামেরা রাখলে যাচাই সহজ হয়। এনআইডির ছবি তোলার সময় কার্ডের ওপর আলো পড়ে ঝলক সৃষ্টি হচ্ছে কি না সেটিও খেয়াল করা দরকার।
সরলীকৃত ও নিয়মিত ই-কেওয়াইসি হিসাবের পার্থক্য
সব অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট একই ধরনের নয়। কম ঝুঁকি এবং নির্দিষ্ট সীমার লেনদেনের জন্য সরলীকৃত ই-কেওয়াইসি ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে বেশি লেনদেন, বেশি আর্থিক কার্যক্রম অথবা অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রে নিয়মিত ই-কেওয়াইসি করা হয়। নিয়মিত যাচাইয়ে ব্যাংক গ্রাহকের পেশা, অর্থের উৎস, ঝুঁকির ধরন এবং অতিরিক্ত তথ্য পরীক্ষা করতে পারে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত লেনদেনের হিসাব বেছে নিলে নির্ধারিত জমা, উত্তোলন ও স্থানান্তরসীমা প্রযোজ্য হবে। ভবিষ্যতে সেই সীমার বেশি লেনদেনের প্রয়োজন হলে ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত ই-কেওয়াইসি বা অতিরিক্ত যাচাই লাগতে পারে। তাই হিসাব খোলার আগে নিজের সম্ভাব্য মাসিক লেনদেন বিবেচনা করুন।
২০২৬ সালের নতুন নির্দেশিকায় সীমিত লেনদেন হিসাবের সীমা
নিচের সারণিটি সব অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাধারণ লেনদেনসীমা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর নির্দেশিকায় সরলীকৃত ই-কেওয়াইসির আওতাভুক্ত নির্দিষ্ট “সীমিত লেনদেন হিসাব”-এর জন্য এসব সীমা উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তার পণ্য ও অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী প্রযোজ্য শর্ত নির্ধারণ করতে পারে।
| লেনদেনের ধরন | একবারে সর্বোচ্চ | মাসে সর্বোচ্চ |
|---|---|---|
| নগদ জমা | ১ লাখ টাকা | ৩ লাখ টাকা |
| স্থানান্তরের মাধ্যমে জমা | ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা | ৫ লাখ টাকা |
| নগদ বা এটিএম উত্তোলন | ১ লাখ টাকা | ৩ লাখ টাকা |
| স্থানান্তরের মাধ্যমে উত্তোলন | ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা | ৫ লাখ টাকা |
| ইলেকট্রনিক পরিশোধ | ১ লাখ টাকা | ৩ লাখ টাকা |
তাই পুরোনো কোনো ব্লগ বা ভিডিওতে দেখা লেনদেনসীমাকে বর্তমান নিয়ম ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ব্যাংকের অফিসিয়াল পণ্য বিবরণ এবং সর্বশেষ চার্জ ও সীমার তালিকা দেখা বেশি নির্ভরযোগ্য।
ব্যাংকভেদে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেন আলাদা হয়?
বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যূনতম কাঠামো নির্ধারণ করলেও প্রতিটি ব্যাংক তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, হিসাবের ধরন এবং নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাইতে পারে। কোনো ডিজিটাল হিসাবে এনআইডি ও লাইভ ছবি প্রধান প্রয়োজনীয়তা হতে পারে, আবার অন্য হিসাবে নমিনির তথ্য, স্বাক্ষর, ঠিকানার প্রমাণ বা আয়ের উৎসসংক্রান্ত কাগজপত্র লাগতে পারে।
এই কারণে “অনলাইন অ্যাকাউন্ট খুলতে শুধু এনআইডিই যথেষ্ট” এমন একটি নিয়ম সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। আবেদন শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা দেখে নেওয়াই ভালো।
আবেদন বাতিল বা দেরি হওয়ার সাধারণ কারণ
এনআইডির অস্পষ্ট ছবি, লাইভ সেলফির সঙ্গে পরিচয়পত্রের ছবির মিল না পাওয়া, নাম বা জন্মতারিখে অসামঞ্জস্য, অসম্পূর্ণ নমিনি তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেওয়ার কারণে আবেদন আটকে যেতে পারে। অনেক সময় প্রযুক্তিগত সমস্যাও হতে পারে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে ব্যাংককে বিকল্প কাগজভিত্তিক পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ রাখতে হবে। তাই কয়েকবার চেষ্টা করেও সমস্যা হলে একই তথ্য বারবার পরিবর্তন না করে ব্যাংকের অফিসিয়াল সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা ভালো।
অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় নিরাপত্তা
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে সুবিধার পাশাপাশি নিজের তথ্য রক্ষার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা অ্যাপের প্রবেশ তথ্য কাউকে দেবেন না। অপরিচিত ব্যক্তিকে ফোনের পর্দা শেয়ার করার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। আবেদন করার সময় ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করুন এবং সম্ভব হলে নিজের মোবাইল ডাটা বা নিরাপদ ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করুন। সন্দেহজনক কল এলে কলারের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ না করে ব্যাংকের অফিসিয়াল নম্বর নিজে খুঁজে যোগাযোগ করুন।
অ্যাকাউন্ট খোলার পর কী করবেন?
ডিজিটাল যাচাই ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফল হলে ব্যাংক নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ই-মেইলে অ্যাকাউন্ট খোলার নিশ্চিতকরণ পাঠাতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিশ্চিতকরণ বার্তায় অ্যাকাউন্টের নাম ও নম্বর, প্রযোজ্য শাখা, হিসাবের ধরন এবং গ্রাহক পরিচিতি নম্বরের তথ্য থাকতে পারে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ড, চেকবই এবং দৈনিক ও মাসিক লেনদেনসীমার নিয়ম জেনে নিন।
কারা পুরো প্রক্রিয়া ঘরে বসে শেষ করতে নাও পারেন?
বৈধ এনআইডি না থাকা ব্যক্তি, পরিচয় তথ্যের অমিল থাকা গ্রাহক অথবা ডিজিটাল মুখমণ্ডল যাচাই বারবার ব্যর্থ হওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে শাখা বা বিকল্প যাচাই প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ ধরনের যৌথ হিসাব, অপ্রাপ্তবয়স্কদের হিসাব, প্রবাসী হিসাব কিংবা বেশি যাচাই প্রয়োজন এমন ব্যাংকিং পণ্যের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত কাগজপত্র লাগতে পারে। এমনকি সফলভাবে ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট খোলার পরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যাংক অতিরিক্ত তথ্য বা স্বাক্ষর চাইতে পারে।
অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের সহজ কৌশল
শুধু দ্রুত অ্যাকাউন্ট খোলা যায় কি না, সেটিকে সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ করা উচিত নয়। হিসাব বেছে নেওয়ার আগে মাসিক লেনদেনসীমা, হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, এটিএম ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা এবং ভবিষ্যতে হিসাবের সুবিধা পরিবর্তন বা বাড়ানোর সুযোগ দেখে নিন। দীর্ঘমেয়াদে নিজের ব্যবহারের ধরন ও প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই হিসাব নির্বাচন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ও উত্তর
১. ঘরে বসে কি সত্যিই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যায়?
হ্যাঁ। বাংলাদেশের একাধিক ব্যাংক বর্তমানে ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা দেয়। তবে কোন ধরনের হিসাব সম্পূর্ণ অনলাইনে খোলা যাবে এবং পরে শাখায় যেতে হবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও পণ্যের নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
২. এনআইডি ছাড়া কি অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ই-কেওয়াইসি নির্দেশিকা বৈধ এনআইডিধারী ব্যক্তিদের ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রযোজ্য। এনআইডি না থাকলে এই ই-কেওয়াইসি পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে শুধু এনআইডি না থাকার কারণে ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত করার কথা নয়; এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রচলিত কেওয়াইসি বা অতিরিক্ত পরিচয় যাচাই পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে।
৩. নমিনির এনআইডি কি অবশ্যই লাগবে?
প্রাপ্তবয়স্ক নমিনির ক্ষেত্রে এনআইডি প্রয়োজন। নমিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা যায়। ব্যাংক নমিনির নাম, জন্মতারিখ, ছবি এবং আবেদনকারীর সঙ্গে সম্পর্কের তথ্যও নিতে পারে।
৪. অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে কি টাকা লাগে?
অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে কোনো ফি, প্রাথমিক জমা বা অন্যান্য চার্জ প্রযোজ্য হবে কি না, তা ব্যাংক ও হিসাবের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। ডেবিট কার্ড, চেকবই, হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্যান্য সেবার জন্যও আলাদা চার্জ থাকতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সর্বশেষ চার্জের তালিকা দেখে নিন।
৫. সেলফি যাচাই না হলে কী করব?
প্রথমে পর্যাপ্ত আলো ও পরিষ্কার পটভূমিতে আবার চেষ্টা করুন। ক্যামেরার দিকে সোজা তাকান এবং মুখ যেন স্পষ্টভাবে দেখা যায় তা নিশ্চিত করুন। নির্ধারিত সংখ্যক চেষ্টা ব্যর্থ হলে ব্যাংক আঙুলের ছাপ যাচাই বা কাগজভিত্তিক কেওয়াইসি পদ্ধতির বিকল্প দিতে পারে।
৬. আবেদন করলেই কি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্ট নম্বর পাওয়া যায়?
পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নিশ্চিতকরণ পাঠায়। কত সময় লাগবে তা ব্যাংক, হিসাবের ধরন, তথ্যের সামঞ্জস্য এবং প্রযুক্তিগত অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই সব অনলাইন আবেদনের জন্য একই সময় ধরে নেওয়া উচিত নয়।
৭. অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খুললে পরে কি ব্যাংকে যেতে হবে?
অনেক সাধারণ ডিজিটাল হিসাবের ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য শাখায় যাওয়া প্রয়োজন হয় না। তবে চেকবই, বিশেষ সেবা, অতিরিক্ত পরিচয় যাচাই অথবা ব্যাংকের নির্দিষ্ট নীতির কারণে পরে শাখায় উপস্থিত হতে বলা হতে পারে।
৮. শিক্ষার্থী বা চাকরি না থাকলেও কি অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়?
শুধু চাকরি না থাকার কারণে সাধারণভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা অসম্ভব হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য আলাদা হিসাব থাকতে পারে। তবে ব্যাংক অর্থের উৎস সম্পর্কে তথ্য চাইলে নিজের প্রকৃত পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক তথ্য দিতে হবে।
৯. ই-টিআইএন কি সব অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য বাধ্যতামূলক?
না, সব সাধারণ ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের জন্য ই-টিআইএন একইভাবে বাধ্যতামূলক নয়। হিসাবের ধরন, গ্রাহকের আর্থিক কার্যক্রম এবং ব্যাংকের নীতির ওপর নির্ভর করে এটি চাওয়া হতে পারে। আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা অনুসরণ করা উচিত।
১০. অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা কি নিরাপদ?
ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার, ওটিপি, পিন ও পাসওয়ার্ড গোপন রাখা এবং সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চললে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি কমানো যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ ই-কেওয়াইসি নির্দেশিকায় পরিচয় যাচাই, নিবন্ধিত যোগাযোগ মাধ্যম এবং গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবু কোনো অনলাইন সেবাকেই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
উপসংহার
ঘরে বসে অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন বাস্তবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বৈধ এনআইডি, সক্রিয় মোবাইল নম্বর, পরিষ্কার লাইভ ছবি এবং প্রয়োজনীয় নমিনি তথ্য প্রস্তুত রাখলে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হয়। তবে হিসাব খোলার আগে লেনদেনসীমা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি ও চার্জ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহারের শর্ত যাচাই করা উচিত। সব সময় ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করুন এবং ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ডসহ সংবেদনশীল তথ্য অন্য কাউকে জানাবেন না।


[…] প্রতিষ্ঠানভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। হিসাব খোলার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হালনাগাদ […]