ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে যেসব ভুল এড়িয়ে চলা উচিত

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার.png

ক্রেডিট কার্ড এখন শুধু বড় কেনাকাটার মাধ্যম নয়। বাজার করা, চিকিৎসা ব্যয়, ইউটিলিটি বিল, ভ্রমণ কিংবা অনলাইন কেনাকাটাসহ দৈনন্দিন নানা খরচে এর ব্যবহার বেড়েছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি স্বল্প সময়ের অর্থ ব্যবস্থাপনাকে সহজ করতে পারে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার, ক্রেডিট কার্ডে থাকা সীমা আপনার নিজের সঞ্চয় নয়; এটি ব্যাংকের দেওয়া একটি ঋণসুবিধা, যা নির্ধারিত নিয়মে ফেরত দিতে হয়।

অনেক ব্যবহারকারীর সমস্যার শুরু হয় কার্ড দিয়ে কেনাকাটার সময় নয়, বরং বিল আসার পর। শুধু ন্যূনতম টাকা পরিশোধ করা, নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়া, অপ্রয়োজনীয় নগদ উত্তোলন কিংবা ছোট ছোট কেনাকাটার হিসাব না রাখার কারণে ধীরে ধীরে বকেয়া বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ মার্চ ২০২৬ এর হালনাগাদ নির্দেশিকায়ও সুদ, বিভিন্ন চার্জ, ন্যূনতম পরিশোধযোগ্য অর্থ এবং শুধু ন্যূনতম অর্থ পরিশোধের সম্ভাব্য পরিণতি গ্রাহকের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তাই ভালো ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী হওয়ার মূল কৌশল বেশি সুবিধা খোঁজা নয়; বরং কত টাকা খরচ করা হচ্ছে, কখন পরিশোধ করতে হবে এবং কোনো খরচের প্রকৃত মূল্য কত দাঁড়াচ্ছে তা জানা। নিচে এমন কিছু সাধারণ ভুল তুলে ধরা হলো, যেগুলো এড়াতে পারলে ক্রেডিট কার্ড অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

  • তথ্যসংক্রান্ত নোট: ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার, বার্ষিক ফি, নগদ উত্তোলনের চার্জ, কিস্তির খরচ এবং অন্যান্য শর্ত ব্যাংক ও কার্ডভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের ব্যাংকের সর্বশেষ শর্ত, চার্জের তালিকা এবং মাসিক বিবরণী যাচাই করুন।

ক্রেডিট কার্ডকে অতিরিক্ত আয় মনে করা

সবচেয়ে মৌলিক ভুল হলো কার্ডের ক্রেডিট সীমাকে নিজের অতিরিক্ত আয় হিসেবে দেখা। ধরুন, আপনার মাসিক আয় ৬০ হাজার টাকা এবং কার্ডের সীমা ২ লাখ টাকা। এর অর্থ এই নয় যে আপনি মাসে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখেন। কার্ডের মাধ্যমে করা প্রতিটি ব্যয়ই ভবিষ্যৎ আয় থেকে পরিশোধ করতে হবে। তাই কেনাকাটার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা কার্যকর: আজ নগদ টাকা দিতে হলে আমি কি এই জিনিসটি কিনতাম? উত্তর না হলে সেই ব্যয় পুনর্বিবেচনা করা ভালো।

শুধু ন্যূনতম পরিশোধ করে নিশ্চিন্ত থাকা

কার্ডের মাসিক বিবরণীতে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থের পাশাপাশি একটি ন্যূনতম পরিশোধযোগ্য অঙ্ক থাকে। ন্যূনতম অর্থ পরিশোধ করা মানে পুরো বকেয়া পরিশোধ হয়ে যাওয়া নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ন্যূনতম অর্থ পরিশোধ করলে হিসাবটি তাৎক্ষণিকভাবে বকেয়া হিসেবে গণ্য হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারে, কিন্তু অবশিষ্ট অর্থের ওপর প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী সুদ যোগ হতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় শুধু ন্যূনতম অর্থ পরিশোধ করলে পুরোনো বকেয়ার সঙ্গে নতুন ব্যয় যোগ হয়ে মোট দায় বাড়তে পারে। আর্থিক সামর্থ্য থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিশোধযোগ্য অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা করা ভালো।

বিলের শেষ তারিখ ভুলে যাওয়া

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত আর্থিক খরচ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ মার্চ ২০২৬ এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, নির্ধারিত পরিশোধের তারিখের পরের দিন থেকে অপরিশোধিত প্রযোজ্য অর্থের ওপর সুদ গণনা করা যেতে পারে এবং ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া অর্থের ওপর কার্যকর বার্ষিক সুদের হার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাই মোবাইল ক্যালেন্ডারে স্মরণবার্তা রাখা অথবা ব্যাংকের সুবিধা থাকলে স্বয়ংক্রিয় বিল পরিশোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু থাকলেও সংশ্লিষ্ট হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ আছে কি না তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ক্রেডিট কার্ড থেকে অপ্রয়োজনীয় নগদ টাকা তোলা

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ক্রেডিট কার্ড থেকে নগদ অর্থ তোলার আগে এর খরচ সম্পর্কে জানা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নির্দেশিকা অনুযায়ী, কার্ডের মোট ক্রেডিট সীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ অগ্রিমের সুযোগ রাখা যেতে পারে। তবে নগদ অগ্রিমের ক্ষেত্রে সাধারণ কেনাকাটার মতো সুদমুক্ত সময় নাও থাকতে পারে এবং ব্যাংকের নির্ধারিত চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। তাই নগদ অগ্রিম নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বর্তমান সুদ ও চার্জের তালিকা দেখে নেওয়া উচিত।

বিলের বিবরণী না দেখা

শুধু মোট কত টাকা দিতে হবে সেটি দেখেই বিল পরিশোধ করলে ভুল লেনদেন, দ্বিগুণ চার্জ কিংবা নিজের অজান্তে চালু থাকা সেবা চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিমাসে বিবরণীর প্রতিটি লেনদেন অন্তত একবার মিলিয়ে দেখা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বিবরণীতে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ, ন্যূনতম পরিশোধ, সুদের হার, প্রযোজ্য চার্জ এবং শেষ তারিখের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার কথা। কোনো অচেনা লেনদেন দেখলে অপেক্ষা না করে কার্ড প্রদানকারী ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

ক্রেডিট সীমার খুব কাছাকাছি নিয়মিত খরচ করা

ব্যাংক একটি বড় সীমা দিয়েছে বলে তার পুরোটাই নিয়মিত ব্যবহার করা আর্থিকভাবে ভালো অভ্যাস নয়। সীমার অধিকাংশ ব্যবহার হয়ে গেলে হঠাৎ জরুরি ব্যয় সামলানোর সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে মাস শেষে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ কঠিন হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে একটি নিজস্ব ব্যয়ের সীমা ঠিক করা কার্যকর। যেমন ব্যাংকের সীমা ২ লাখ টাকা হলেও আপনার মাসিক বাজেট অনুযায়ী আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে ৩০ বা ৪০ হাজার টাকার বেশি কার্ডে ব্যয় করবেন না।

ছাড় দেখে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা

ক্রেডিট কার্ডের ছাড়, ক্যাশব্যাক বা কিস্তির সুবিধা অনেক সময় উপকারী হতে পারে। সমস্যা হয় যখন শুধু সুবিধা পাওয়ার জন্যই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে, ২০ হাজার টাকার কোনো অপ্রয়োজনীয় পণ্যে ১০ শতাংশ ছাড় পেলেও আপনাকে ১৮ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। তাই কোনো অফার গ্রহণের আগে পণ্যটি সত্যিই প্রয়োজন কি না, সেটি বাজেটের মধ্যে আছে কি না এবং বিল সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব কি না তা বিবেচনা করা উচিত। সুবিধা কেনাকাটার অতিরিক্ত লাভ হতে পারে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার কারণ হওয়া উচিত নয়।

কিস্তির প্রকৃত খরচ না বোঝা

মাসিক ছোট অঙ্কের কিস্তি অনেক সময় বড় কেনাকাটাকে সহজ মনে করায়। কিন্তু একই সঙ্গে একাধিক কিস্তি চালু থাকলে ভবিষ্যৎ কয়েক মাসের আয়ের একটি অংশ আগেই ব্যয় হয়ে যায়। কোনো কিস্তি নেওয়ার আগে মোট কত টাকা পরিশোধ হবে, রূপান্তর চার্জ আছে কি না এবং মাসে সব কিস্তি মিলিয়ে কত টাকা দিতে হবে তা হিসাব করা দরকার। শুধু “মাসে কত” না দেখে “সব মিলিয়ে কত” প্রশ্নটির উত্তর জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কার্ডের নিরাপত্তায় অসতর্ক থাকা

কার্ড নম্বর, পিন, সিভিভি, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে কেউ যোগাযোগ করলেও গোপন নিরাপত্তা তথ্য দেওয়া নিরাপদ নয়। সন্দেহজনক বার্তার লিংকে প্রবেশ করা, অজানা উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা অথবা অপরিচিত ওয়েবসাইটে কার্ডের তথ্য সংরক্ষণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ক্রেডিট কার্ড নির্দেশিকায় দুই ধাপের পরিচয় যাচাই, লেনদেনের তাৎক্ষণিক বার্তা এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মতো নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো অচেনা বা সন্দেহজনক লেনদেন দেখা গেলে দ্রুত কার্ড প্রদানকারী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিষয়টি জানানো এবং প্রয়োজনে কার্ড বন্ধ করার অনুরোধ করা উচিত।

একাধিক ক্রেডিট কার্ডের হিসাব একসঙ্গে না রাখা

একাধিক কার্ড থাকলে প্রত্যেকটির বিলের তারিখ, বার্ষিক ফি, চলমান কিস্তি এবং বকেয়া আলাদা হতে পারে। ফলে একটি কার্ডের ব্যয় কম মনে হলেও সব কার্ডের মোট ঋণ বড় হয়ে যেতে পারে। মাসে অন্তত একবার সব কার্ডের মোট বকেয়া এক জায়গায় লিখে দেখা একটি কার্যকর অভ্যাস। যেসব কার্ড দীর্ঘদিন ব্যবহার করছেন না, সেগুলোর ফি ও শর্ত যাচাই করুন এবং প্রয়োজন না থাকলে ব্যাংকের নির্ধারিত পদ্ধতিতে বন্ধ করার কথা বিবেচনা করুন।

অতিরিক্ত ক্রেডিট সীমা চাওয়ার আগে সক্ষমতা যাচাই না করা

বড় ক্রেডিট সীমা সব সময় বেশি অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা বোঝায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, করপোরেট কার্ড ছাড়া ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডে জামানতবিহীন সীমা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। নির্দিষ্ট তরল জামানতের বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও মোট ক্রেডিট সীমা ৪০ লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না। এগুলো নিয়ন্ত্রক সর্বোচ্চ সীমা; ব্যক্তিগত ব্যয়ের লক্ষ্য নয়। একজন গ্রাহকের জন্য বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আয়, বিদ্যমান ঋণের চাপ এবং পরিশোধের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত নিয়ম

কার্ড ব্যবহারের জন্য একটি সহজ ব্যক্তিগত নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে: যে ব্যয়ের অর্থ আপনার আয় বা মাসিক বাজেটে রয়েছে, মূলত সেই ব্যয়ই কার্ডের মাধ্যমে করার চেষ্টা করুন। মাসের শুরুতে কার্ডে সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি নিজস্ব সীমা নির্ধারণ করুন, নিয়মিত লেনদেন পরীক্ষা করুন এবং বিল তৈরি হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধের পরিকল্পনা রাখুন। এতে ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা ব্যবহার করার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত বকেয়া তৈরির ঝুঁকিও কমানো যায়।

ক্রেডিট কার্ড সম্পর্কে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. ক্রেডিট কার্ডের পুরো বিল পরিশোধ করা কি ভালো?

সামর্থ্য থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিশোধযোগ্য অর্থ দেওয়া অপরিশোধিত বকেয়া বহন না করার একটি কার্যকর উপায়। এতে কেনাকাটাসংক্রান্ত বকেয়ার ওপর অতিরিক্ত সুদ যোগ হওয়ার ঝুঁকি কমে। এজন্য মাসজুড়ে এমন পরিমাণ ব্যয় করা উচিত, যা বিল আসার পর নিজের নিয়মিত আয় বা নির্ধারিত বাজেট থেকেই পরিশোধ করা সম্ভব।

২. শুধু ন্যূনতম পরিমাণ দিলে কী হয়?

ন্যূনতম পরিমাণ নির্ধারিত সময়ে দিলে হিসাবটি তাৎক্ষণিকভাবে ওভারডিউ হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারে, কিন্তু বাকি টাকা পরিশোধ হয়ে যায় না। অপরিশোধিত অংশের ওপর প্রযোজ্য সুদ এবং পরবর্তী মাসের নতুন ব্যয় যোগ হয়ে মোট দায় বাড়তে পারে। তাই ন্যূনতম পরিশোধকে নিয়মিত কৌশল না বানিয়ে জরুরি পরিস্থিতির সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা ভালো।

৩. নির্ধারিত তারিখে ন্যূনতম টাকাও না দিলে কী হতে পারে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী বিবরণীতে উল্লেখ করা ন্যূনতম পরিমাণ নির্ধারিত তারিখের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিশোধ না হলে ক্রেডিট কার্ড হিসাবটি ওভারডিউ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে এমন তথ্য সিআইবিতে প্রতিবেদন করার বিধানও রয়েছে। তাই বিলের শেষ তারিখকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

৪. ক্রেডিট কার্ড থেকে নগদ টাকা তোলা কি ঠিক?

ক্রেডিট কার্ড থেকে নগদ অগ্রিম নেওয়ার সুবিধা থাকলেও এটি নিয়মিত ব্যবহার করলে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হতে পারে। নগদ অগ্রিমের ক্ষেত্রে সাধারণ কেনাকাটার মতো সুদমুক্ত সময় নাও থাকতে পারে এবং ব্যাংকের নির্ধারিত উত্তোলন চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। তাই নগদ অগ্রিম নেওয়ার আগে নিজের ব্যাংকের বর্তমান সুদ, চার্জ এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত যাচাই করা উচিত।

৫. ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার কত হতে পারে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ মার্চ ২০২৬-এর নির্দেশনা অনুযায়ী বকেয়া পরিশোধযোগ্য অর্থের ওপর কার্যকর বার্ষিক সুদের হার সর্বোচ্চ ২৫% হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কার্ডে প্রকৃত হার এর চেয়ে কম হতে পারে। তাই নিজের ব্যাংকের বর্তমান শর্ত ও চার্জের তালিকা যাচাই করাই সঠিক পদ্ধতি।

৬. বিলের শেষ তারিখ সরকারি ছুটির দিনে পড়লে কী হবে?

বর্তমান নীতিমালায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত তারিখ শুক্রবার, শনিবার অথবা স্বীকৃত সরকারি বা ব্যাংক ছুটির দিনে পড়লে পরবর্তী কর্মদিবসে অর্থ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ দিতে হবে। তারপরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেই পরিশোধ করলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা অর্থ স্থানান্তরে দেরির ঝুঁকি কমে।

৭. অচেনা লেনদেন দেখলে প্রথমে কী করা উচিত?

অচেনা লেনদেন দেখামাত্র কার্ড প্রদানকারী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নম্বরে যোগাযোগ করা উচিত। সম্ভব হলে ব্যাংকের অ্যাপ বা অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্ড সাময়িকভাবে বন্ধ করুন এবং লেনদেনটির বিষয়ে অভিযোগ জানান। ওটিপি, পিন বা অন্য কোনো নিরাপত্তা তথ্য কাউকে দেবেন না এবং অভিযোগের রেফারেন্স সংরক্ষণ করুন।

৮. বড় ক্রেডিট সীমা থাকা কি ভালো?

বড় সীমা জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত নমনীয়তা দিতে পারে, কিন্তু এটি বেশি খরচ করার অনুমতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। আপনার ব্যক্তিগত সীমা নির্ধারণ করা উচিত মাসিক আয় ও পরিশোধের সামর্থ্যের ভিত্তিতে। ব্যাংক যত টাকা ব্যবহারের সুযোগ দেয় এবং আপনি বাস্তবে যত টাকা নিরাপদে পরিশোধ করতে পারেন, এই দুই অঙ্ক এক নাও হতে পারে।

৯. একাধিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা কি সমস্যা?

একাধিক কার্ড নিজে থেকে সমস্যা নয়, যদি প্রতিটি কার্ডের বিল, খরচ ও শেষ তারিখ নিয়মিত নজরে রাখা যায়। সমস্যা তৈরি হয় যখন ভিন্ন কার্ডে ছোট ছোট বকেয়া জমে মোট ঋণের পরিমাণ বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তাই সব কার্ডের মোট ব্যয় মাসে অন্তত একবার একসঙ্গে হিসাব করা দরকার।

১০. ক্রেডিট কার্ড নিরাপদে ব্যবহারের সবচেয়ে সহজ নিয়ম কী?

একটি সহজ নিয়ম হলো এমন পরিমাণ অর্থ কার্ডে ব্যয় করা, যা বিল আসার পর পরিশোধ করার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি লেনদেনের বার্তা পরীক্ষা করা, মাসিক বিবরণী মিলিয়ে দেখা, ওটিপি ও পিন গোপন রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভ্যাস সাধারণ আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

উপসংহার

ক্রেডিট কার্ড ভালো বা খারাপ কোনো আর্থিক পণ্য নয়; ফল নির্ভর করে এটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। সময়মতো সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ, নগদ উত্তোলনে সতর্কতা, মাসিক বিবরণী পরীক্ষা, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে ব্যয় এবং কার্ডের নিরাপত্তা বজায় রাখলে এটি দৈনন্দিন অর্থ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হতে পারে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্রেডিট সীমা কত বড় তা নয়, বরং প্রতিমাসে নিজের অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্ত রাখা যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বিআরপিডি-১ সার্কুলার নং ০৯, ১৫ মার্চ ২০২৬, ক্রেডিট কার্ড পরিচালনা সংক্রান্ত নির্দেশিকা। ব্যাংক ও কার্ডভেদে সুদ, ফি, চার্জ এবং অন্যান্য শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বর্তমান শর্ত যাচাই করুন।

By Admin

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *