বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি ও চার্জ তুলনা (সব ব্যাংক এক নজরে)

ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি.png

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার সময় অনেক গ্রাহক শুধু কার্ডের ক্রেডিট সীমা, ছাড়, কিস্তি সুবিধা বা বিমানবন্দর লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ দেখেন। কিন্তু একটি কার্ড দীর্ঘদিন ব্যবহারে আসলে কত টাকা খরচ হবে, সেটি নির্ধারণ করে বার্ষিক ফি, বিলম্ব ফি, নগদ উত্তোলন ফি, এসএমএস সেবা ফি, বৈদেশিক লেনদেনের অতিরিক্ত চার্জ এবং মূল্য সংযোজন কর। ফলে আকর্ষণীয় সুবিধার একটি কার্ডও ভুল ব্যবহারে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

একই ব্যাংকের ক্লাসিক, গোল্ড, প্লাটিনাম, সিগনেচার বা ওয়ার্ল্ড কার্ডের ফি এক নয়। কোনো ব্যাংক নির্দিষ্ট সংখ্যক কেনাকাটার লেনদেন করলে বার্ষিক ফি মওকুফ করে, আবার কোনো ব্যাংক জমা হওয়া রিওয়ার্ড পয়েন্ট ব্যবহার করে ফি মওকুফের সুযোগ দেয়। তাই শুধু ঘোষিত বার্ষিক ফি দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ফি মওকুফের শর্ত, সুদের হার এবং অন্যান্য ব্যবহারভিত্তিক চার্জও একসঙ্গে যাচাই করতে হয়।

এই তুলনাটি প্রস্তুত করার সময় ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, সর্বশেষ প্রকাশিত চার্জ সূচি এবং কার্ডের শর্তাবলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংক যেকোনো সময় ফি, সুবিধা বা মওকুফের নিয়ম পরিবর্তন করতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হালনাগাদ চার্জ সূচি দেখে এবং গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে চূড়ান্ত তথ্য নিশ্চিত করা উচিত।

ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি কী?

ক্রেডিট কার্ড সক্রিয় রাখা এবং কার্ডের বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহারের জন্য ব্যাংক সাধারণত বছরে একবার যে অর্থ নেয়, সেটিই বার্ষিক ফি। কোনো কোনো ব্যাংক প্রথম বছর এই ফি নেয় না, তবে দ্বিতীয় বছর থেকে নবায়ন ফি আরোপ করে। আবার কিছু কার্ডে প্রথম বছর থেকেই ফি প্রযোজ্য হতে পারে। উচ্চ শ্রেণির কার্ডে লাউঞ্জ, ভ্রমণসুবিধা, বেশি রিওয়ার্ড পয়েন্ট বা বিশেষ সেবা থাকায় বার্ষিক ফিও সাধারণত বেশি হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকের চার্জ সূচিতে উল্লেখ করা ফি অনেক সময় মূল্য সংযোজন কর ছাড়া দেখানো হয়। উদাহরণ হিসেবে, বার্ষিক ফি ১,৫০০ টাকা হলে তার সঙ্গে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর যুক্ত হয়ে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ ১,৭২৫ টাকা হতে পারে। তাই তুলনার সময় মূল ফি এবং করসহ সম্ভাব্য মোট ব্যয় আলাদাভাবে দেখা ভালো।

বার্ষিক ফি ছাড়াও যেসব চার্জ যাচাই করা জরুরি

ক্রেডিট কার্ডের মোট খরচ শুধু বার্ষিক ফির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ন্যূনতম বিল পরিশোধ না করলে বিলম্ব ফি আরোপ হতে পারে। সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ না করলে অপরিশোধিত অর্থের ওপর সুদ যোগ হয়। এটিএম থেকে টাকা তুললে নগদ উত্তোলন ফি এবং সাধারণত উত্তোলনের দিন থেকেই সুদ গণনা শুরু হতে পারে।

এ ছাড়া কার্ড প্রতিস্থাপন ফি, অতিরিক্ত সীমা ব্যবহারের ফি, কাগজের হিসাব বিবরণী ফি, বিক্রয় রসিদ সংগ্রহের ফি, বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর চার্জ, মোবাইল আর্থিক সেবার ওয়ালেটে টাকা স্থানান্তর ফি এবং কিস্তি আগাম বন্ধ করার ফি থাকতে পারে। যিনি নিয়মিত বিদেশি ওয়েবসাইটে কেনাকাটা করেন, তাঁর কাছে বৈদেশিক লেনদেনের অতিরিক্ত চার্জ বার্ষিক ফির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এক নজরে নির্বাচিত ব্যাংকের বার্ষিক ফি তুলনা

ব্যাংক কার্ডের ধরন ঘোষিত বার্ষিক ফি ফি মওকুফের উল্লেখযোগ্য শর্ত
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ক্লাসিক ১,৫০০ টাকা ১৮টি পস বা ই-কমার্স কেনাকাটার লেনদেন
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক গোল্ড ৩,০০০ টাকা ১৮টি পস বা ই-কমার্স কেনাকাটার লেনদেন
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক প্লাটিনাম ৫,০০০ টাকা ১৮টি পস বা ই-কমার্স কেনাকাটার লেনদেন
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক বিজনেস ৫,০০০ টাকা রিওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে মওকুফ
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক সিগনেচার বা ওয়ার্ল্ড ১০,০০০ টাকা রিওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে মওকুফ
ব্র্যাক ব্যাংক ক্লাসিক বা গোল্ড পর্যায়ের নির্বাচিত কার্ড প্রায় ১,৫০০ টাকা থেকে শুরু কার্ড ও চলমান কর্মসূচি অনুযায়ী ব্যয় বা রিওয়ার্ড পয়েন্ট
ব্র্যাক ব্যাংক প্লাটিনাম, ওয়ার্ল্ড ও উচ্চ শ্রেণির কার্ড প্রায় ৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা কার্ডভেদে আলাদা মওকুফের নিয়ম
ডাচ-বাংলা ব্যাংক ক্লাসিক বা গোল্ড সীমাভেদে ৫০০ টাকা থেকে শুরু রিওয়ার্ড পয়েন্টের মাধ্যমে মওকুফের সুযোগ
ইস্টার্ন ব্যাংক নির্বাচিত প্লাটিনাম ও উচ্চ শ্রেণির কার্ড সর্বশেষ চার্জ সূচি অনুযায়ী সাধারণত নির্ধারিত সংখ্যক বার্ষিক লেনদেন
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কার্ডভেদে সর্বশেষ চার্জ সূচি অনুযায়ী দ্বিতীয় বছর থেকে রিওয়ার্ড বা নির্ধারিত শর্ত

দ্রষ্টব্য: সারণির অর্থের সঙ্গে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর, আবগারি শুল্ক বা অন্যান্য সরকারি চার্জ যুক্ত হতে পারে। ব্যাংকের বিশেষ কর্মসূচিতে প্রথম বছরের ফি বা নির্দিষ্ট কার্ডের ফি আলাদা হতে পারে।

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের ফি ও চার্জ

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মে ২০২৬ থেকে কার্যকর চার্জ সূচি অনুযায়ী ক্লাসিক কার্ডের বার্ষিক ফি ১,৫০০ টাকা, গোল্ড কার্ডের ৩,০০০ টাকা, প্লাটিনাম ও বিজনেস কার্ডের ৫,০০০ টাকা এবং সিগনেচার বা ওয়ার্ল্ড কার্ডের ১০,০০০ টাকা। ক্লাসিক, গোল্ড ও প্লাটিনাম কার্ডে বছরে ১৮টি পস বা ই-কমার্স কেনাকাটার লেনদেন করলে বার্ষিক ফি মওকুফের সুযোগ রয়েছে। বিজনেস, সিগনেচার এবং ওয়ার্ল্ড কার্ডে সাধারণ লেনদেনসংখ্যার পরিবর্তে রিওয়ার্ড পয়েন্ট ব্যবহার করে ফি মওকুফ করতে হয়।

এই ব্যাংকের নিজস্ব এটিএম থেকে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে টাকা তুললে উত্তোলিত অর্থের ২ দশমিক ৫ শতাংশ অথবা ১৫০ টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ ফি প্রযোজ্য। অন্য ব্যাংকের এটিএমে স্থানীয় উত্তোলনের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ অথবা ১৫০ টাকা এবং বৈদেশিক উত্তোলনে ৩ শতাংশ অথবা ৫ মার্কিন ডলার, যেটি বেশি, তা প্রযোজ্য হতে পারে। বিদেশে মার্কিন ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রায় লেনদেনে ৩ শতাংশ রূপান্তর চার্জও রয়েছে।

চার্জ সূচি অনুযায়ী কার্ডের সুদের হার মাসে ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বা বছরে ২৫ শতাংশ। মোবাইল আর্থিক সেবার ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তরে লেনদেনের ১ শতাংশ ফি রয়েছে, যদিও উপায় ওয়ালেটে এই ফি প্রযোজ্য নয়। মূল কার্ডে বছরে ৪০০ টাকা এসএমএস ব্যাংকিং ফিও থাকতে পারে। এসব ফি বিবেচনায় ইউসিবি কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফ করা গেলেও নগদ উত্তোলন বা নিয়মিত বকেয়া রাখলে মোট খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

ব্র্যাক ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি

ব্র্যাক ব্যাংক ক্লাসিক, গোল্ড, প্লাটিনাম, মিলেনিয়াল টাইটানিয়াম, ওয়ার্ল্ড, সিগনেচার এবং ইনফিনিটসহ বিভিন্ন শ্রেণির কার্ড দেয়। ২০২৪ সালের বিস্তারিত চার্জ সূচিতে মূল কার্ডের বার্ষিক ফি কার্ডভেদে ১,৫০০ টাকা থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে কিছু গোল্ড ও ক্লাসিক কার্ডে ১,৫০০ টাকা, প্লাটিনাম ও মিলেনিয়াল পর্যায়ের কার্ডে প্রায় ৩,০০০ টাকা, ওয়ার্ল্ড বা সিগনেচার পর্যায়ে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা এবং ইনফিনিট কার্ডে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক ফি ছিল।

তবে ব্র্যাক ব্যাংকের ওয়েবসাইটে আগস্ট ২০২৬-এর নতুন ক্রেডিট কার্ড চার্জ সূচি প্রকাশের উল্লেখ রয়েছে। ফলে পুরোনো কোনো সারণির তথ্য ধরে কার্ড নির্বাচন করা ঠিক হবে না। আবেদন করার আগে আগস্ট ২০২৬-এর চার্জ সূচিতে সংশ্লিষ্ট কার্ডের বার্ষিক ফি, বিলম্ব ফি, নগদ উত্তোলন ফি এবং অন্যান্য শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।

ব্র্যাক ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে প্রথম বছরের বার্ষিক ফি মওকুফের কর্মসূচি দেয়। কিছু অফারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ন্যূনতম ব্যয়ের শর্ত পূরণ করলে প্রথম বছরের সম্পূর্ণ ফি মওকুফ হতে পারে। তবে এটি স্থায়ী সুবিধা নয় এবং কার্ডভেদে শর্ত পরিবর্তিত হয়। তাই শুধু বিজ্ঞাপনে “ফি মওকুফ” দেখে আবেদন না করে দ্বিতীয় বছর থেকে কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সেটি লিখিতভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

ডাচ-বাংলা ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে বার্ষিক ফি নির্ধারণের পদ্ধতি অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় আলাদা। ক্লাসিক বা গোল্ড কার্ডের ক্ষেত্রে কার্ডের অনুমোদিত সীমা অনুযায়ী ফি বাড়তে পারে। অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় কার্ডে ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সীমার জন্য বার্ষিক বা নবায়ন ফি ৫০০ টাকা। ৫০,০০১ থেকে ১ লাখ টাকা সীমায় ৬৫০ টাকা, ১ লাখ ১ টাকা থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা সীমায় ৮০০ টাকা এবং এর পরের উচ্চ সীমাগুলোতে ধাপে ধাপে ফি বাড়ে।

ব্যাংকটি প্রথম বছরের ফি বিনামূল্যে রাখার কথা উল্লেখ করেছে। দ্বিতীয় বছর থেকে সীমাভিত্তিক নবায়ন ফি প্রযোজ্য হয়। রিওয়ার্ড পয়েন্ট জমিয়ে বার্ষিক ফি আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করার সুবিধাও রয়েছে। ব্যাংকের সাম্প্রতিক কার্ড বৈশিষ্ট্যের তথ্যে সাধারণ বার্ষিক বা নবায়ন ফি ৫০০ টাকা থেকে শুরু হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কম সীমার কার্ড ব্যবহারকারী এবং নিয়মিত সম্পূর্ণ বিল পরিশোধকারী গ্রাহকের জন্য এই সীমাভিত্তিক ফি কাঠামো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে। তবে উচ্চ সীমা নিলে বার্ষিক ফিও বাড়ে। তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্রেডিট সীমা নেওয়ার আগে ফি বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

ইস্টার্ন ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের ফি মওকুফ সুবিধা

ইস্টার্ন ব্যাংক ২৫ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর একটি হালনাগাদ কার্ড চার্জ সূচি প্রকাশ করেছে। ব্যাংকটির বিভিন্ন ভিসা, মাস্টারকার্ড, ডাইনার্স ক্লাব এবং যৌথ ব্র্যান্ডের কার্ড রয়েছে। কার্ডের ধরন অনুযায়ী বার্ষিক ফি ও মওকুফের শর্ত আলাদা হওয়ায় নির্দিষ্ট কার্ডের সর্বশেষ চার্জ সূচি যাচাই করা জরুরি।

ইস্টার্ন ব্যাংকের ভিসা প্লাটিনাম কার্ডে বছরে ২৪টি লেনদেন করলে নবায়ন ফি না দেওয়ার সুবিধা উল্লেখ করা হয়েছে। ডাইনার্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল কার্ডে বছরে ১৮টি লেনদেন সম্পন্ন করলে বার্ষিক নবায়ন ফি মওকুফ করা যায়। আবার কিছু যৌথ ব্র্যান্ডের কার্ডে প্রথম বছরের ইস্যু ফি এবং পরবর্তী নবায়ন ফি মওকুফের আলাদা সুবিধা রয়েছে।

এখানে গ্রাহকের লক্ষ্য হওয়া উচিত মওকুফের জন্য প্রয়োজনীয় লেনদেনসংখ্যা স্বাভাবিক কেনাকাটার মাধ্যমে পূরণ করা। শুধু একটি ফি বাঁচাতে অপ্রয়োজনীয় লেনদেন করলে প্রকৃত সাশ্রয় হয় না।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের হালনাগাদ চার্জ সূচি

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন কার্ড চার্জ সূচি প্রকাশ করেছে। ব্যাংকটি সাধারণ ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি ব্যবসায়িক এবং ইসলামি উজরাহ কার্ডের জন্য পৃথক চার্জ সূচি রাখে। ফলে একজন গ্রাহককে তাঁর নির্বাচিত কার্ডের জন্য সঠিক নথিটি দেখতে হবে।

আগের চার্জ সূচিগুলোতে ক্লাসিক কার্ডে প্রায় ১,৫০০ টাকা, গোল্ডে ৩,০০০ টাকা এবং প্লাটিনাম বা টাইটানিয়াম কার্ডে ৫,০০০ টাকার বার্ষিক ফির উদাহরণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বছর থেকে নির্ধারিত সংখ্যক লেনদেন অথবা রিওয়ার্ড পয়েন্টের মাধ্যমে ফি মওকুফের সুযোগও ছিল। তবে ২০২৬ সালের নতুন সূচিতে পরিবর্তন থাকতে পারে, তাই পুরোনো অঙ্ককে বর্তমান চূড়ান্ত ফি হিসেবে ধরা উচিত নয়।

বার্ষিক ফি তুলনার সময় বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায়

নিজের ব্যবহার যদি বছরে খুব কম হয়, তাহলে বেশি বার্ষিক ফির প্রিমিয়াম কার্ড নেওয়া সাধারণত লাভজনক নয়। বিপরীতে, নিয়মিত কেনাকাটা, ভ্রমণ বা লাউঞ্জ ব্যবহারের প্রয়োজন থাকলে বেশি ফি দিয়েও নির্দিষ্ট সুবিধা থেকে বাস্তব মূল্য পাওয়া যেতে পারে। মূল বিষয় হলো সুবিধাটির বাজারমূল্য নয়, আপনি সেটি সত্যিই কতবার ব্যবহার করবেন।

কার্ড বাছাইয়ের আগে এক বছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি হিসাব করুন। এতে করসহ বার্ষিক ফি, এসএমএস ফি, সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর চার্জ, নগদ উত্তোলন এবং কিস্তির খরচ যোগ করুন। এরপর ফি মওকুফের শর্ত আপনার স্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব কি না, তা দেখুন। এই পদ্ধতিতে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের বদলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কার্ড নির্বাচন করা সহজ হবে।

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি ও চার্জ তুলনা: পার্ট ২

ক্রেডিট কার্ডের ঘোষিত বার্ষিক ফি কম হলেই কার্ডটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো কার্ডে বার্ষিক ফি তুলনামূলক কম হলেও বিলম্ব ফি, নগদ উত্তোলন চার্জ, বৈদেশিক লেনদেন চার্জ এবং ডিজিটাল ওয়ালেটে টাকা যোগ করার খরচ বেশি হতে পারে। আবার উচ্চ বার্ষিক ফির কোনো কার্ড নিয়মিত লেনদেনের মাধ্যমে ফি মওকুফের সুযোগ দিলে বাস্তবে সেটির ব্যবহার খরচ কমে যেতে পারে।

এই অংশে সিটি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ঢাকা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক এবং কমিউনিটি ব্যাংকের নির্বাচিত ক্রেডিট কার্ডের ফি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তুলনার সময় শুধু বার্ষিক ফি নয়, বরং কার্ডটি সক্রিয় রাখলে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর সম্ভাব্য মোট খরচ কেমন হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করা হয়েছে।

আরও কয়েকটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের ফি এক নজরে

ব্যাংক কার্ডের ধরন বার্ষিক বা নবায়ন ফি বিলম্ব ফি নগদ উত্তোলন চার্জ
সিটি ব্যাংক অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস ব্লু প্রথম বছর ১,২৫০ টাকা, পরবর্তী বছর ২,৫০০ টাকা ৬০০ টাকা ১৫০ টাকা বা ২.৫ শতাংশ, যেটি বেশি
সিটি ব্যাংক অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস গোল্ড প্রথম বছর ৩,০০০ টাকা, পরবর্তী বছর ৬,০০০ টাকা ৮৫০ টাকা ১৫০ টাকা বা ২.৫ শতাংশ, যেটি বেশি
সিটি ব্যাংক অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস প্লাটিনাম ২৭,৫০০ টাকা ১,০০০ টাকা ১৫০ টাকা বা ২.৫ শতাংশ, যেটি বেশি
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ভিসা সিলভার ১,৫০০ টাকা ৪৫০ টাকা উত্তোলিত অর্থের ২.৫ শতাংশ
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ভিসা গোল্ড ৩,০০০ টাকা ৬০০ টাকা উত্তোলিত অর্থের ২.৫ শতাংশ
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ভিসা প্লাটিনাম ৫,০০০ টাকা ১,০০০ টাকা উত্তোলিত অর্থের ২.৫ শতাংশ
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ভিসা সিগনেচার ১২,০০০ টাকা ১,০০০ টাকা উত্তোলিত অর্থের ২.৫ শতাংশ
ঢাকা ব্যাংক লোকাল গোল্ড ২,০০০ টাকা নবায়ন ফি ৫০০ টাকা ২.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ১৫০ টাকা
ঢাকা ব্যাংক প্লাটিনাম বা টাইটানিয়াম ৫,০০০ টাকা ৭৫০ টাকা ২.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ২৫০ টাকা
ঢাকা ব্যাংক সিগনেচার বা ওয়ার্ল্ড ৭,০০০ টাকা ১,০০০ টাকা ২.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ২৫০ টাকা
ন্যাশনাল ব্যাংক ক্লাসিক ডুয়েল ১,০০০ টাকা চার্জ সূচি অনুযায়ী কার্ডের শর্ত অনুযায়ী
ন্যাশনাল ব্যাংক গোল্ড ডুয়েল ২,০০০ টাকা চার্জ সূচি অনুযায়ী কার্ডের শর্ত অনুযায়ী
ন্যাশনাল ব্যাংক প্লাটিনাম ডুয়েল ৪,০০০ টাকা চার্জ সূচি অনুযায়ী কার্ডের শর্ত অনুযায়ী
এনআরবি ব্যাংক ভিসা ক্লাসিক ১,৫০০ টাকা নবায়ন ফি ৪০০ টাকা বা ৫ মার্কিন ডলার নিজস্ব এটিএমে ২ শতাংশ বা ১০০ টাকা
এনআরবি ব্যাংক ভিসা গোল্ড ২,০০০ টাকা নবায়ন ফি ৫০০ টাকা বা ৬ মার্কিন ডলার নিজস্ব এটিএমে ২ শতাংশ বা ১০০ টাকা
এনআরবি ব্যাংক ভিসা প্লাটিনাম ৪,০০০ টাকা নবায়ন ফি ৭০০ টাকা বা ৭ মার্কিন ডলার নিজস্ব এটিএমে ২ শতাংশ বা ১০০ টাকা
কমিউনিটি ব্যাংক ভিসা গোল্ড ডুয়েল ১,৫০০ টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর ৭০০ টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর সর্বশেষ চার্জ সূচি অনুযায়ী
কমিউনিটি ব্যাংক ভিসা প্লাটিনাম ডুয়েল ১,৫০০ টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর ৯০০ টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর সর্বশেষ চার্জ সূচি অনুযায়ী

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য: অধিকাংশ ব্যাংকের ঘোষিত ফির সঙ্গে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং প্রযোজ্য সরকারি আবগারি শুল্ক আলাদাভাবে যুক্ত হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রায় প্রদর্শিত চার্জ লেনদেনের সময়কার বিনিময় হার অনুযায়ী টাকায় রূপান্তর হতে পারে।

সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি ও ব্যবহার খরচ

সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডগুলোকে প্রধানত অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস ও ভিসা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হালনাগাদ অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস চার্জ সূচি অনুযায়ী ব্লু কার্ডের প্রথম বছরের বার্ষিক ফি ১,২৫০ টাকা এবং দ্বিতীয় বছর থেকে ২,৫০০ টাকা। গোল্ড কার্ডে প্রথম বছর ৩,০০০ টাকা এবং দ্বিতীয় বছর থেকে ৬,০০০ টাকা। প্লাটিনাম কার্ডের বার্ষিক ফি ২৭,৫০০ টাকা। প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর এসব অঙ্কের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগ হয়।

অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস ব্লু, গোল্ড ও প্লাটিনাম কার্ডের স্থানীয় নগদ উত্তোলন ফি প্রতি লেনদেনে ১৫০ টাকা অথবা উত্তোলিত অর্থের ২.৫ শতাংশ, যেটি বেশি। বিলম্ব ফি কার্ডভেদে ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকা এবং অতিরিক্ত সীমা ব্যবহারের চার্জ ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। সাধারণ কেনাকাটা ও নগদ উত্তোলনের ওপর বার্ষিক সুদের হার ২৫ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।

সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রথম বছরের কম ফি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দ্বিতীয় বছরের ফি দেখা বিশেষভাবে জরুরি। উদাহরণ হিসেবে ব্লু ও গোল্ড কার্ডের দ্বিতীয় বছরের ফি প্রথম বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। আবার অ্যামেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড সব দোকানে গ্রহণ করা হয় কি না, সেটিও নিজের নিয়মিত কেনাকাটার স্থান অনুযায়ী যাচাই করা উচিত।

বিদেশে মার্কিন ডলার ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রায় লেনদেন করলে ৩ শতাংশ অতিরিক্ত রূপান্তর চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ যোগ করার ক্ষেত্রে ১০ টাকা অথবা লেনদেনের ১ শতাংশ, যেটি বেশি, সেই চার্জ রয়েছে। সিটিটাচ থেকে ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ওয়ালেটে অর্থ পাঠালে ১০০ টাকা বা ২ শতাংশ পর্যন্ত প্রক্রিয়াকরণ ফিও লাগতে পারে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ক্রেডিট কার্ডের ফি তুলনা

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আগস্ট ২০২৬ থেকে কার্যকর চার্জ সূচি অনুযায়ী ভিসা সিলভার কার্ডের বার্ষিক ফি ১,৫০০ টাকা, ভিসা গোল্ডের ৩,০০০ টাকা, সিম্পলি ক্যাশ কার্ডের ৫,০০০ টাকা এবং ভিসা প্লাটিনামের ৫,০০০ টাকা। স্মার্ট কার্ডের বার্ষিক ফি ৩,০০০ টাকা এবং ভিসা সিগনেচার কার্ডের ফি ১২,০০০ টাকা। আন্তর্জাতিক প্লাটিনাম কার্ডের বার্ষিক ফি ১০৫ মার্কিন ডলার।

কার্ডভেদে বিলম্ব ফি ৪৫০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা এবং অতিরিক্ত সীমা ব্যবহারের ফি ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সাধারণত উত্তোলিত অর্থের ২.৫ শতাংশ চার্জ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক প্লাটিনাম কার্ডে ২.৫ শতাংশ অথবা ৫ মার্কিন ডলার, যেটি বেশি, সেটি প্রযোজ্য। নগদ উত্তোলনের দিন থেকেই সুদ গণনা শুরু হয়।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সাধারণ অর্থায়ন চার্জ বছরে ২৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ সুদমুক্ত সময় ৪৫ দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আগের মাসের সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ করলে কেনাকাটার ওপর সুদ এড়ানো যায়। তবে শুধু ন্যূনতম অর্থ পরিশোধ করলে বাকি অংশের সঙ্গে বিভিন্ন ফি ও চার্জের ওপরও সুদ যোগ হতে পারে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড স্মার্ট কার্ডে বছরে তিন লাখ টাকার বেশি খুচরা কেনাকাটা করলে দ্বিতীয় বছর থেকে বার্ষিক ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মওকুফ হওয়ার সুবিধা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই যাঁর স্বাভাবিক বার্ষিক ব্যয় এই সীমার কাছাকাছি, তাঁর জন্য কার্ডটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু শুধু ফি মওকুফের জন্য অতিরিক্ত কেনাকাটা করা উচিত নয়।

ঢাকা ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের ফি ও অতিরিক্ত চার্জ

ঢাকা ব্যাংকের জানুয়ারি ২০২৫-এ প্রকাশিত চার্জ সূচি অনুযায়ী গোল্ড কার্ডের প্রথম বছর বিনামূল্যে। প্লাটিনাম ও টাইটানিয়াম কার্ডের প্রথম বছরের ফি ২,৫০০ টাকা এবং সিগনেচার ও ওয়ার্ল্ড কার্ডের প্রথম বছরের ফি ৭,০০০ টাকা। পরবর্তী নবায়নের সময় লোকাল গোল্ড কার্ডে ২,০০০ টাকা, ডুয়েল বা আন্তর্জাতিক গোল্ড কার্ডে ৩,০০০ টাকা, প্লাটিনাম ও টাইটানিয়ামে ৫,০০০ টাকা এবং সিগনেচার ও ওয়ার্ল্ড কার্ডে ৭,০০০ টাকা দিতে হয়।

গোল্ড কার্ডে নগদ উত্তোলনের চার্জ ২.৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ১৫০ টাকা। প্লাটিনাম, টাইটানিয়াম, সিগনেচার ও ওয়ার্ল্ড কার্ডে এটি ২.৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ২৫০ টাকা। বিলম্ব ফি গোল্ডে ৫০০ টাকা, প্লাটিনাম বা টাইটানিয়ামে ৭৫০ টাকা এবং সিগনেচার বা ওয়ার্ল্ডে ১,০০০ টাকা। একই অঙ্ক অতিরিক্ত সীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ঢাকা ব্যাংকের ক্ষেত্রে বার্ষিক ফির বাইরেও প্লাস্টিক নবায়ন ফি রয়েছে। গোল্ড কার্ডে এটি ৪০০ টাকা, প্লাটিনাম বা টাইটানিয়ামে ৫০০ টাকা এবং সিগনেচার বা ওয়ার্ল্ড কার্ডে ৬০০ টাকা। বার্ষিক লেনদেন সতর্কতা সেবার ফি ১০০ টাকা এবং কার্ড থেকে ডিজিটাল ওয়ালেট বা হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের চার্জ ১.৫ শতাংশ অথবা ১৫০ টাকা, যেটি বেশি।

ন্যাশনাল ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি

ন্যাশনাল ব্যাংকের অফিসিয়াল কার্ড তথ্য অনুযায়ী ক্লাসিক ডুয়েল কার্ডের বার্ষিক বা নবায়ন ফি ১,০০০ টাকা, গোল্ড ডুয়েল কার্ডের ২,০০০ টাকা এবং প্লাটিনাম ডুয়েল কার্ডের ৪,০০০ টাকা। দ্বিতীয় সম্পূরক কার্ড পর্যন্ত বিনামূল্যে দেওয়ার সুবিধা রয়েছে। কার্ড প্রতিস্থাপন ফি ৫০০ টাকা এবং কাগজে নতুন পিন নেওয়ার ফি ৫০০ টাকা।

এই ফি কাঠামো অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্লাসিক ও গোল্ড কার্ড তুলনামূলক কম বার্ষিক ফির শ্রেণিতে পড়ে। তবে শুধু বার্ষিক ফি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিলম্ব ফি, নগদ উত্তোলন চার্জ, সুদের হার এবং ফি মওকুফের কোনো চলমান সুবিধা আছে কি না, তা সরাসরি ব্যাংকের কাছ থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এনআরবি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের নবায়ন ফি ও মওকুফ

এনআরবি ব্যাংকের ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত চার্জ সূচি অনুযায়ী ভিসা ক্লাসিক কার্ডের নবায়ন ফি ১,৫০০ টাকা, গোল্ডের ২,০০০ টাকা এবং প্লাটিনামের ৪,০০০ টাকা। পার্ল প্রিমিয়াম কার্ডের নবায়ন ফি ২,০০০ টাকা, পার্ল সিগনেচারের ৫,০০০ টাকা এবং সাধারণ সিগনেচার কার্ডের ১০,০০০ টাকা। সিগনেচার ও পার্ল সিগনেচার ছাড়া অন্য নির্বাচিত কার্ডের প্রাথমিক সদস্য ফি বিনামূল্যে।

ভিসা ক্লাসিক, গোল্ড এবং প্লাটিনামসহ নির্বাচিত কার্ডে প্রথম বছরের বার্ষিক ফি বিনামূল্যে। মূল কার্ড দিয়ে বছরে ১৪টি পস, ই-কমার্স বা কার্ড চেক লেনদেন করলে নবায়ন ফি শতভাগ মওকুফের সুযোগ রয়েছে। তবে সিগনেচার ও পার্ল সিগনেচার কার্ডে ১৪টি লেনদেনের পাশাপাশি মোট বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ তিন লাখ টাকা হতে হয়।

এনআরবি ব্যাংকের নিজস্ব এটিএম থেকে নগদ উত্তোলনের চার্জ ২ শতাংশ অথবা ১০০ টাকা, যেটি বেশি। অন্য ব্যাংকের এটিএমে একই মূল চার্জের সঙ্গে নেটওয়ার্ক ফি যোগ হয়। আন্তর্জাতিক উত্তোলনে ২.৫ মার্কিন ডলার অথবা ২.৫ শতাংশ, যেটি বেশি, তার সঙ্গে রূপান্তর চার্জ যোগ হতে পারে। সাধারণ ক্লাসিক, গোল্ড, প্লাটিনাম ও সিগনেচার কার্ডে বার্ষিক সুদের হার ২৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে।

কমিউনিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের ফি কাঠামো

কমিউনিটি ব্যাংকের ২০২৬ সালের হালনাগাদ চার্জ সূচিতে ভিসা গোল্ড ডুয়েল এবং ভিসা প্লাটিনাম ডুয়েল কার্ডের মূল বার্ষিক ফি ১,৫০০ টাকা এবং প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর। প্রথম সম্পূরক কার্ড বিনামূল্যে, আর দ্বিতীয় সম্পূরক কার্ড থেকে বছরে ৭৫০ টাকা ও কর দিতে হয়।

গোল্ড কার্ডের বিলম্ব ফি ৭০০ টাকা এবং প্লাটিনামের ৯০০ টাকা, যার সঙ্গে মূল্য সংযোজন কর যুক্ত হয়। অতিরিক্ত সীমা ব্যবহারের ফি গোল্ডে ৫০০ টাকা এবং প্লাটিনামে ৬০০ টাকা। ন্যূনতম মাসিক পরিশোধ সাধারণত মোট বকেয়ার ৫ শতাংশ অথবা ৫০০ টাকা, যেটি বেশি।

আগের চার্জ সূচিতে বছরে অন্তত ১২টি লেনদেন অথবা মোট এক লাখ টাকা ব্যয় করলে বার্ষিক ফি মওকুফের শর্ত উল্লেখ ছিল। তবে ফি মওকুফের বর্তমান নিয়ম কার্ড অনুমোদন ও ব্যাংকের নীতির ওপর নির্ভর করতে পারে। আবেদন করার সময় শর্তটি লিখিতভাবে নিশ্চিত করা ভালো।

কম বার্ষিক ফি এবং কম মোট খরচ এক বিষয় নয়

একজন গ্রাহক বছরে ১২ বা ১৪টি স্বাভাবিক কেনাকাটার মাধ্যমে বার্ষিক ফি মওকুফ করতে পারলে দুই বা তিন হাজার টাকার ঘোষিত ফিও বাস্তবে শূন্য হয়ে যেতে পারে। বিপরীতে, ১,০০০ টাকার কম বার্ষিক ফির একটি কার্ডে নিয়মিত বিলম্ব, নগদ উত্তোলন বা ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর করলে বছরে কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ক্রেডিট কার্ডকে ঋণের স্থায়ী উৎস হিসেবে না দেখে স্বল্পমেয়াদি পরিশোধ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। প্রতিটি মাসের সম্পূর্ণ বিল নির্ধারিত তারিখের আগে পরিশোধ করলে সুদ ও বিলম্ব ফি এড়ানো যায়। এটিএম থেকে নগদ তোলা এড়িয়ে চললে নগদ উত্তোলন ফি এবং প্রথম দিন থেকে গণনা হওয়া সুদ থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

কার্ড নির্বাচন করার আগে এই হিসাবটি করুন

প্রথমে কার্ডটির করসহ বার্ষিক ফি লিখুন। এরপর বার্ষিক এসএমএস ফি, সম্ভাব্য ডিজিটাল ওয়ালেট চার্জ, বৈদেশিক লেনদেনের রূপান্তর চার্জ এবং বছরে কতবার নগদ উত্তোলন করতে পারেন, তার একটি আনুমানিক হিসাব যোগ করুন। সবশেষে ফি মওকুফের শর্ত আপনার স্বাভাবিক কেনাকাটার মাধ্যমে পূরণ হবে কি না, তা বিবেচনা করুন।

উদাহরণ হিসেবে, একটি কার্ডের বার্ষিক ফি ৩,০০০ টাকা হলেও ১৪টি স্বাভাবিক লেনদেনে তা মওকুফ হলে কার্ডটি সাশ্রয়ী হতে পারে। কিন্তু ১,৫০০ টাকার একটি কার্ডে ফি মওকুফ না থাকলে এবং বছরে এসএমএস ও অন্যান্য সেবা ফি যোগ হলে সেটির মোট খরচ বেশি হতে পারে। তাই শুধু বিজ্ঞাপিত ফি নয়, নিজের ব্যবহারভিত্তিক বার্ষিক মোট খরচই তুলনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি ও চার্জ তুলনা: পার্ট ৩

আগের দুই অংশে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পরিচিত ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি, নবায়ন ফি, নগদ উত্তোলন চার্জ এবং বিলম্ব ফি তুলনা করা হয়েছে। এই অংশে প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ওয়ান ব্যাংক এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের কার্ড চার্জ বিশ্লেষণ করা হলো। পাশাপাশি কোন ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য কোন ফি কাঠামো বাস্তবে উপযোগী হতে পারে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি কার্যকর পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।

ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা মূল্যায়নের সময় শুধু বার্ষিক ফি দেখা যথেষ্ট নয়। একটি কার্ডে বার্ষিক ফি না থাকলেও বকেয়া রাখলে সুদ, নগদ উত্তোলন, বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর, মোবাইল আর্থিক সেবায় টাকা স্থানান্তর এবং বিলম্বের কারণে উল্লেখযোগ্য খরচ হতে পারে। তাই “ফি-মুক্ত” এবং “ব্যবহার খরচ-মুক্ত” একই অর্থ বহন করে না।

আরও কয়েকটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের ফি এক নজরে

ব্যাংক কার্ডের ধরন বার্ষিক ফি বিলম্ব ফি নগদ উত্তোলন চার্জ
প্রাইম ব্যাংক জিরো বাই প্রাইম বার্ষিক ও নবায়ন ফি নেই প্রযোজ্য চার্জ সূচি অনুযায়ী প্রযোজ্য চার্জ সূচি অনুযায়ী
ব্যাংক এশিয়া সিলভার বা ক্লাসিক ১,৫০০ টাকা ৫০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ১৫০ টাকা
ব্যাংক এশিয়া গোল্ড ২,৫০০ টাকা ৭০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ১৫০ টাকা
ব্যাংক এশিয়া প্লাটিনাম বা টাইটানিয়াম ৪,০০০ টাকা ৮০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ১৫০ টাকা
ব্যাংক এশিয়া সিগনেচার ৭,০০০ টাকা ১,০০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ১৫০ টাকা
ব্যাংক এশিয়া ওয়ার্ল্ড এলিট ১৫,০০০ টাকা ১,২০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ১৫০ টাকা
ওয়ান ব্যাংক ক্লাসিক ১,৫০০ টাকা ৫০০ টাকা নিজস্ব এটিএমে ১.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
ওয়ান ব্যাংক গোল্ড ৩,০০০ টাকা ৫০০ টাকা নিজস্ব এটিএমে ১.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
ওয়ান ব্যাংক প্লাটিনাম ৫,০০০ টাকা ৭০০ টাকা নিজস্ব এটিএমে ১.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
ওয়ান ব্যাংক অনন্যা উইমেনস প্লাটিনাম ৪,০০০ টাকা ৭০০ টাকা নিজস্ব এটিএমে ১.৫ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক ক্লাসিক লোকাল ১,২০০ টাকা ৩৫০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক গোল্ড লোকাল ১,৫০০ টাকা ৫০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক প্লাটিনাম লোকাল ২,৫০০ টাকা ৫০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক প্লাটিনাম ডুয়েল ৬,০০০ টাকা ৫০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক ওয়ার্ল্ড ৬,৫০০ টাকা ৫০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক সিগনেচার ১০,০০০ টাকা ১,০০০ টাকা ২ শতাংশ বা ন্যূনতম ২০০ টাকা

দ্রষ্টব্য: সারণিতে প্রদর্শিত ফি ও চার্জের সঙ্গে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর এবং সরকারি আবগারি শুল্ক যুক্ত হতে পারে। ব্যাংক যেকোনো সময় চার্জ সংশোধন করতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট কার্ডের বর্তমান চার্জ সূচি যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রাইম ব্যাংকের ফি-মুক্ত ক্রেডিট কার্ড

প্রাইম ব্যাংক ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে “জিরো বাই প্রাইম” নামে একটি ভিসা সিগনেচার ক্রেডিট কার্ড চালু করে। ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এই কার্ডে ইস্যু ফি, বার্ষিক ফি, নবায়ন ফি, কিস্তি প্রক্রিয়াকরণ ফি এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় অর্থ স্থানান্তরের ফি নেই। প্রচলিত কার্ডে এসব খাত থেকে যে নিয়মিত খরচ তৈরি হয়, তা কমানোর দিক থেকে এটি বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ড বাজারে একটি ব্যতিক্রমী কাঠামো।

তবে কার্ডটির নামের সঙ্গে “জিরো” থাকলেও সব ধরনের ব্যবহার সম্পূর্ণ খরচমুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে সুদ বা বিলম্বসংক্রান্ত চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। একইভাবে এটিএম থেকে নগদ উত্তোলন, বৈদেশিক লেনদেন বা বিশেষ সেবার ক্ষেত্রে আলাদা শর্ত থাকতে পারে। ফলে আবেদন করার আগে বর্তমান চার্জ সূচি এবং কার্ডের পূর্ণ শর্ত পড়তে হবে।

যাঁরা প্রতি মাসে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করেন কিন্তু শুধু বার্ষিক ও নবায়ন ফি এড়াতে চান, তাঁদের জন্য এ ধরনের কার্ড কার্যকর হতে পারে। তবে অনুমোদনের যোগ্যতা, আয়ের শর্ত এবং ক্রেডিট সীমা আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা ও ব্যাংকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

ব্যাংক এশিয়া ক্রেডিট কার্ডের ফি ও চার্জ

ব্যাংক এশিয়ার ১ মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর চার্জ সূচি অনুযায়ী সিলভার বা ক্লাসিক কার্ডের বার্ষিক ফি ১,৫০০ টাকা, গোল্ড কার্ডের ২,৫০০ টাকা, প্লাটিনাম বা টাইটানিয়াম কার্ডের ৪,০০০ টাকা, সিগনেচার কার্ডের ৭,০০০ টাকা এবং ওয়ার্ল্ড এলিট কার্ডের ১৫,০০০ টাকা। প্রতিটি শ্রেণির প্রথম সম্পূরক কার্ড বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

স্থানীয় এটিএম থেকে নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে উত্তোলিত অর্থের ২ শতাংশ অথবা ১৫০ টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ চার্জ প্রযোজ্য। বিদেশি এটিএমে এটি ৩ শতাংশ অথবা ৪ মার্কিন ডলার, যেটি বেশি। কার্ড থেকে মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবে টাকা স্থানান্তরের চার্জ ১ শতাংশ এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের চার্জ ১.২৫ শতাংশ।

ব্যাংক এশিয়ার কার্ডে বার্ষিক সুদের হার ২৫ শতাংশ। স্থানীয় বিলম্ব ফি কার্ডভেদে ৫০০ টাকা থেকে ১,২০০ টাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তরের অতিরিক্ত চার্জ ৩ শতাংশ। বার্ষিক এসএমএস সেবা ফি ৩০০ টাকা। রিওয়ার্ড পয়েন্ট ব্যবহার করে কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফ করার সুযোগও ব্যাংকটি উল্লেখ করেছে।

যাঁরা নিয়মিত কার্ডে কেনাকাটা করেন এবং অর্জিত রিওয়ার্ড পয়েন্ট সঠিকভাবে ব্যবহার করেন, তাঁরা ঘোষিত বার্ষিক ফির একটি অংশ বা সম্পূর্ণ ফি কমাতে পারেন। তবে রিওয়ার্ড পয়েন্টের মেয়াদ, প্রয়োজনীয় পয়েন্ট এবং কোন ধরনের লেনদেনে পয়েন্ট পাওয়া যায় না, তা আগে জেনে নেওয়া দরকার।

ওয়ান ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি

ওয়ান ব্যাংকের ২০২৬ সালের চার্জ সূচি অনুযায়ী ক্লাসিক কার্ডের বার্ষিক ফি ১,৫০০ টাকা, গোল্ড কার্ডের ৩,০০০ টাকা, প্লাটিনাম কার্ডের ৫,০০০ টাকা এবং অনন্যা উইমেনস প্লাটিনাম কার্ডের ৪,০০০ টাকা। সুরক্ষিত কার্ডের ক্ষেত্রে ক্লাসিকের ফি ১,০০০ টাকা, গোল্ডের ২,০০০ টাকা এবং প্লাটিনাম বা অনন্যা কার্ডের ফি ৪,০০০ টাকা।

ফি ফেরত পাওয়ার যোগ্য হতে বছরে অন্তত ১৮টি অনুমোদিত লেনদেন করতে হয়। প্রতিটি লেনদেনের পরিমাণ কমপক্ষে ৫০০ টাকা বা ৫ মার্কিন ডলার হতে হবে। পস, বাংলা কিউআর, ই-কমার্স এবং মোবাইল আর্থিক সেবার অনুমোদিত লেনদেন এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এক বছরে তিনটির বেশি বিলম্ব ফি বা অতিরিক্ত সীমা ব্যবহারের ফি হলে ১৮টি লেনদেন সম্পন্ন করলেও ফি ফেরতের সুবিধা পাওয়া যাবে না।

নিজস্ব এটিএমে নগদ উত্তোলনের চার্জ ১.৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ২০০ টাকা এবং অন্য ব্যাংকের এটিএমে ২ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ৩০০ টাকা। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ৫ মার্কিন ডলার প্রযোজ্য। বিদেশি লেনদেনে ৩ শতাংশ অতিরিক্ত রূপান্তর চার্জ এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় টাকা যোগ করার ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ফি রয়েছে।

এই কার্ডগুলোর সাধারণ মাসিক সুদের হার ২.০৯ শতাংশ, যা বার্ষিক হিসাবে প্রায় ২৫ শতাংশ। সুরক্ষিত কার্ডে মাসিক হার ১.৬৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। তাই যাঁরা সম্পূর্ণ বিল না দিয়ে নিয়মিত বকেয়া রাখেন, তাঁদের কাছে বার্ষিক ফির চেয়ে সুদের খরচ অনেক বেশি হয়ে উঠতে পারে।

সাউথইস্ট ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের চার্জ

সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর চার্জ সূচিতে ক্লাসিক লোকাল কার্ডের বার্ষিক ফি ১,২০০ টাকা, ক্লাসিক ডুয়েল কার্ডের ১,৭০০ টাকা, গোল্ড লোকাল কার্ডের ১,৫০০ টাকা এবং প্লাটিনাম লোকাল কার্ডের ২,৫০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। প্লাটিনাম ডুয়েল কার্ডের ফি ৬,০০০ টাকা, ওয়ার্ল্ড কার্ডের ৬,৫০০ টাকা এবং সিগনেচার কার্ডের ১০,০০০ টাকা।

স্থানীয় নগদ উত্তোলনের চার্জ উত্তোলিত অর্থের ২ শতাংশ অথবা ২০০ টাকা, যেটি বেশি। বিদেশি মুদ্রায় উত্তোলনে ২ শতাংশ অথবা ৩ মার্কিন ডলার প্রযোজ্য। কার্ড থেকে মোবাইল ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তরের চার্জ ২.৩০ শতাংশ। নিজ ব্যাংকের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরে ২ শতাংশ, অন্য ব্যাংকে বিইএফটিএনের মাধ্যমে পাঠালে ৩ শতাংশ এবং এনপিএসবির মাধ্যমে পাঠালে ২.৩০ শতাংশ চার্জ রয়েছে।

ক্লাসিক কার্ডের বিলম্ব ফি ৩৫০ টাকা, অধিকাংশ গোল্ড ও প্লাটিনাম কার্ডে ৫০০ টাকা এবং সিগনেচার কার্ডে ১,০০০ টাকা। সব প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডে বার্ষিক সুদের হার ২৫ শতাংশ এবং এসএমএস সেবা ফি ৩০০ টাকা। এসব অঙ্কের সঙ্গে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মূল্য সংযোজন কর যুক্ত হতে পারে।

কোন ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য কোন কার্ড উপযোগী?

যিনি মাসে অল্প কয়েকবার কার্ড ব্যবহার করেন এবং লাউঞ্জ বা বিশেষ ভ্রমণসুবিধা প্রয়োজন হয় না, তাঁর জন্য কম বার্ষিক ফির ক্লাসিক বা গোল্ড কার্ড যথেষ্ট হতে পারে। এই ক্ষেত্রে সহজ ফি মওকুফের শর্ত, কম বিলম্ব ফি এবং কম নগদ উত্তোলন চার্জকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

যিনি নিয়মিত সুপারশপ, অনলাইন কেনাকাটা, রেস্তোরাঁ বা দৈনন্দিন বিল পরিশোধে কার্ড ব্যবহার করেন, তিনি লেনদেনসংখ্যার ভিত্তিতে ফি মওকুফ হয় এমন কার্ড বিবেচনা করতে পারেন। তবে লেনদেন পূরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করলে বার্ষিক ফি বাঁচানোর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

যাঁরা নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন, তাঁদের শুধু আন্তর্জাতিক লাউঞ্জ সুবিধা দেখে কার্ড নেওয়া উচিত নয়। বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর চার্জ, আন্তর্জাতিক এটিএম ফি, পাস বা লাউঞ্জ ব্যবহারের সীমা, সহযাত্রীর প্রবেশমূল্য এবং অতিরিক্ত ভিজিটের চার্জও তুলনা করতে হবে।

উচ্চ বার্ষিক ফির সিগনেচার, ওয়ার্ল্ড বা প্লাটিনাম কার্ড তখনই যুক্তিসংগত, যখন কার্ডধারী নিয়মিতভাবে এর লাউঞ্জ, ভ্রমণ, রিওয়ার্ড এবং জীবনযাপনভিত্তিক সুবিধা ব্যবহার করেন। শুধু কার্ডের উচ্চ শ্রেণির নাম বা বেশি ক্রেডিট সীমার জন্য এমন কার্ড নেওয়া আর্থিকভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।

ক্রেডিট কার্ড বাছাইয়ের পাঁচ ধাপের ব্যবহারিক পদ্ধতি

প্রথম ধাপে গত ছয় মাসের নিজের স্বাভাবিক কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের পরিমাণ হিসাব করুন। দ্বিতীয় ধাপে কার্ডটির করসহ বার্ষিক ফি এবং ফি মওকুফের সুনির্দিষ্ট শর্ত লিখে নিন। তৃতীয় ধাপে এসএমএস, বৈদেশিক লেনদেন, মোবাইল ওয়ালেট, নগদ উত্তোলন এবং কিস্তির সম্ভাব্য খরচ যোগ করুন।

চতুর্থ ধাপে কার্ডের সুবিধাগুলোর মধ্যে আপনি বাস্তবে কোনগুলো ব্যবহার করবেন, তা নির্ধারণ করুন। পঞ্চম ধাপে অন্তত তিনটি ব্যাংকের কার্ডের এক বছরের সম্ভাব্য মোট খরচ পাশাপাশি তুলনা করুন। এই পদ্ধতিতে আকর্ষণীয় প্রচারণার পরিবর্তে নিজের ব্যবহার ও আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি ও চার্জ সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

১. বাংলাদেশের কোন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি সবচেয়ে কম?

একটি নির্দিষ্ট ব্যাংককে সব ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম ফির ব্যাংক বলা যায় না। কারণ কার্ডের শ্রেণি, ক্রেডিট সীমা, প্রথম বছরের ছাড় এবং ফি মওকুফের নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃত খরচ পরিবর্তিত হয়। কিছু ক্লাসিক কার্ডের ঘোষিত বার্ষিক ফি ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে থাকে। আবার কিছু কার্ডে ঘোষিত ফি বেশি হলেও নির্ধারিত সংখ্যক স্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ফি মওকুফ করা যায়। তাই করসহ কার্যকর বার্ষিক খরচ তুলনা করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

২. বার্ষিক ফি মওকুফ বলতে কী বোঝায়?

বার্ষিক ফি মওকুফ অর্থ ব্যাংক নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের বিনিময়ে কার্ডের বার্ষিক বা নবায়ন ফি আদায় করে না অথবা আদায় করা ফি পরে হিসাবে ফেরত দেয়। শর্তটি নির্দিষ্ট সংখ্যক কেনাকাটার লেনদেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক ব্যয় বা প্রয়োজনীয় রিওয়ার্ড পয়েন্ট হতে পারে। নগদ উত্তোলন, ফি, সুদ বা কিছু বিশেষ লেনদেন সাধারণত যোগ্য লেনদেন হিসেবে গণনা নাও হতে পারে।

৩. প্রথম বছর বিনামূল্যের কার্ড কি সত্যিই খরচমুক্ত?

প্রথম বছর বার্ষিক ফি না থাকলেও কার্ডটি সম্পূর্ণ খরচমুক্ত নয়। এসএমএস সেবা, মূল্য সংযোজন কর, নগদ উত্তোলন, বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর, বিলম্ব, অতিরিক্ত সীমা ব্যবহার এবং মোবাইল ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তরের জন্য আলাদা চার্জ থাকতে পারে। দ্বিতীয় বছর থেকে কত টাকা নবায়ন ফি হবে এবং সেটি মওকুফের সুযোগ আছে কি না, আবেদন করার আগেই জানা উচিত।

৪. ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফির সঙ্গে কি মূল্য সংযোজন কর যোগ হয়?

সাধারণভাবে ব্যাংকের বিভিন্ন ফি ও সেবা চার্জের সঙ্গে প্রযোজ্য হারে মূল্য সংযোজন কর যোগ হয়। ফলে চার্জ সূচিতে বার্ষিক ফি ২,০০০ টাকা লেখা থাকলে করসহ পরিশোধযোগ্য অর্থ এর চেয়ে বেশি হতে পারে। সরকারি নীতি অনুযায়ী আবগারি শুল্কও আলাদাভাবে প্রযোজ্য হতে পারে। সঠিক মোট খরচ জানতে মাসিক হিসাব বিবরণী বা ব্যাংকের করসহ চার্জ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৫. সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করলে কি কোনো সুদ দিতে হয়?

আগের হিসাব বিবরণীর সম্পূর্ণ বকেয়া নির্ধারিত তারিখের মধ্যে পরিশোধ করলে সাধারণ কেনাকাটার ওপর সাধারণত সুদ দিতে হয় না। তবে নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে উত্তোলনের দিন থেকেই সুদ গণনা শুরু হতে পারে। শুধু ন্যূনতম পরিমাণ পরিশোধ করলে অবশিষ্ট বকেয়ার ওপর ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সুদ যোগ হয় এবং নতুন কেনাকাটার সুদমুক্ত সুবিধাও প্রভাবিত হতে পারে।

৬. ক্রেডিট কার্ড থেকে নগদ টাকা তোলা কি ভালো সিদ্ধান্ত?

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নগদ টাকা তোলা এড়িয়ে চলা ভালো। নগদ উত্তোলনের সময় শতাংশভিত্তিক বা ন্যূনতম একটি ফি নেওয়া হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে উত্তোলনের দিন থেকেই সুদ শুরু হয়। ফলে অল্প সময়ের জন্য টাকা তুললেও মোট খরচ দ্রুত বাড়তে পারে। নগদ প্রয়োজনের জন্য নিজের ব্যাংক হিসাবের ডেবিট কার্ড বা কম খরচের বিকল্প ব্যবহার করা বেশি কার্যকর।

৭. একটি কার্ডের ফি মওকুফ করতে অপ্রয়োজনীয় লেনদেন করা উচিত কি?

শুধু বার্ষিক ফি বাঁচাতে প্রয়োজনের বাইরে কেনাকাটা করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে, ২,০০০ টাকার ফি মওকুফ করতে কয়েক হাজার টাকার অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনলে প্রকৃত সাশ্রয় হয় না। নিজের স্বাভাবিক বাজার, ওষুধ, জ্বালানি, অনলাইন কেনাকাটা বা ইউটিলিটি বিলের মাধ্যমে শর্ত পূরণ করা গেলে ফি মওকুফ সুবিধাজনক।

৮. একাধিক ক্রেডিট কার্ড রাখলে কী সমস্যা হতে পারে?

একাধিক কার্ড থাকলে মোট ক্রেডিট সীমা বাড়লেও প্রতিটি কার্ডের বার্ষিক ফি, বিল পরিশোধের তারিখ এবং ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হতে পারে। কোনো কার্ড ব্যবহার না করলেও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করলে বার্ষিক ফি জমতে পারে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কার্ড রাখলে অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় এবং বিল ভুলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

৯. ক্রেডিট কার্ড বন্ধ করার আগে কী করতে হবে?

কার্ড বন্ধ করার আগে সম্পূর্ণ বকেয়া, কিস্তি, সুদ, সরকারি শুল্ক এবং অন্যান্য চার্জ পরিশোধ করতে হবে। জমা রিওয়ার্ড পয়েন্ট ব্যবহার করা এবং কোনো স্বয়ংক্রিয় বিল পরিশোধ যুক্ত থাকলে সেটি পরিবর্তন করাও জরুরি। শুধু কার্ড কেটে ফেলা বা ব্যবহার বন্ধ করা যথেষ্ট নয়। ব্যাংকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বন্ধ করে লিখিত বা ডিজিটাল নিশ্চয়তা সংগ্রহ করা উচিত।

১০. নতুন ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার আগে ব্যাংককে কোন প্রশ্নগুলো করা উচিত?

ব্যাংকের কাছে প্রথম ও দ্বিতীয় বছরের বার্ষিক ফি, করসহ মোট খরচ, ফি মওকুফের শর্ত, সুদের হার, বিলম্ব ফি, নগদ উত্তোলন চার্জ, বৈদেশিক লেনদেনের অতিরিক্ত হার এবং কার্ড বন্ধ করার ফি জানতে হবে। পাশাপাশি সুদমুক্ত সময়, ন্যূনতম পরিশোধের নিয়ম, রিওয়ার্ড পয়েন্টের মেয়াদ এবং কোনো প্রচারণামূলক সুবিধা কত দিন কার্যকর থাকবে, সেটিও লিখিতভাবে নিশ্চিত করা ভালো।

উপসংহার

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি ব্যাংক ও কার্ডের শ্রেণি অনুযায়ী উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। কম ফি, বেশি সুবিধা বা উচ্চ ক্রেডিট সীমা এর কোনো একটিকে আলাদাভাবে দেখে কার্ড নির্বাচন করা উচিত নয়। করসহ বার্ষিক ফি, মওকুফের বাস্তবসম্মত শর্ত, সুদ, বিলম্ব ফি, নগদ উত্তোলন এবং নিজের ব্যবহারধরন একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ক্রেডিট কার্ড দৈনন্দিন অর্থ পরিশোধ, জরুরি কেনাকাটা এবং স্বল্পমেয়াদি নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হলো প্রতি মাসে সম্পূর্ণ বিল সময়মতো পরিশোধ করা, নগদ উত্তোলন এড়িয়ে চলা এবং চার্জ সূচি নিয়মিত পরীক্ষা করা। এই তিনটি অভ্যাস অনুসরণ করলে বার্ষিক ফি ও অন্যান্য খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে ক্রেডিট কার্ডের প্রয়োজনীয় সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

By Admin

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *